পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রামে জ্যান্ত কেউটে সাপের পুজো অনুষ্ঠিত হল। তবে গ্রামের মানুষ এই সাপকে ‘সাপ’ বলে ডাকেন না। তাঁদের কাছে তিনি ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’। প্রতি বছর মহা সমারোহে এই পুজো হয়। বৃহস্পতিবার পুজো উপলক্ষে গ্রামে ভিড় জমান দূর-দূরান্তের বহু মানুষ। গ্রামজুড়ে অবাধে ঘুরে বেড়ানো বিষধর কেউটেকে দেবীর রূপেই মানেন গ্রামবাসীরা। গ্রামের মেয়ে প্রিয়া মুখোপাধ্যায় বলেন, “ছোট থেকেই আমরা মায়ের সঙ্গেই বড় হয়েছি। উনি কখনও আমাদের ক্ষতি করেননি। আমাদের গ্রামের এবং বাড়ির সর্বত্র উনি ঘুরে বেড়ান। আর এই পুজো আমাদের প্রধান পুজো।”
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখিত বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনির সেই দেবীই এখানে ঝঙ্কেশ্বরী রূপে বিরাজ করছেন। তাঁদের দাবি, এখানে সাপ সাধারণত কাউকে কামড়ায় না। পুজোর দিন সন্ধ্যায় গ্রাম পরিক্রমার পর মন্দিরের সামনে একটি মাটির কলস ভাঙা হয়। বিশ্বাস, সেই কলসের টুকরো বাড়িতে রাখলে বিষধর সাপ আর সেই বাড়িতে ঢোকে না। গ্রামের মানুষ দংশনকেও ‘কামড়’ নয়, ‘প্রসাদ’ বলে থাকেন। মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষ বলেন, “আমি এখানে পুজো দিলাম এবং সর্বসাধারণ আর মঙ্গলকোটের যাতে অগ্রগতি হয় সেই প্রার্থনা করে আশীর্বাদ নিলাম।”
শুধু পলসোনা নয়, মঙ্গলকোটের ছোটপোষলা, মুসারু, নিগন এবং ভাতারের বড় পোষলা, শিকোত্তর ও মুকুন্দপুর-সহ মোট সাতটি গ্রামে এই ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর প্রচলন রয়েছে। অতীতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু গবেষক ও সর্পবিশারদ এই গ্রামে এসে মানুষ ও বিষধর সাপের সহাবস্থান নিয়ে গবেষণাও করেছেন। সর্পবিশারদ ধীমান ভট্টাচার্য জানান, এই সাপের বিজ্ঞানসম্মত নাম নাজা কাউথিয়া (Naja kaouthia)। এটি কেউটে প্রজাতির বিষধর সাপ। তিনি বলেন, দংশনে বিষক্রিয়া হতে পারে, তবে এই গ্রামে মানুষ ও সাপের মধ্যে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফলে দংশনের ঘটনা খুবই কম। কারণ, গ্রামের মানুষ সাপকে বিরক্ত করেন না, তাই সাপও অকারণে আক্রমণ করে না। লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় আচার এবং মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক বিরল ঐতিহ্য আজও জীবন্ত রয়েছে মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রামে। প্রতি বছর এই অনন্য পুজো দেখতে ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ।