হাতের মুঠোয় প্রাচীন ইতিহাস! কাটোয়া-বর্ধমান থেকে উদ্ধার দুর্লভ পুঁথি, পড়া যাবে মোবাইল অ্যাপেই
News18 বাংলা | ৩০ জুলাই ২০২৬
: এবার আর গবেষণার জন্য ঘুরে বেড়াতে হবে না গ্রন্থাগার থেকে মঠ-মন্দিরে। হাতের মুঠোয় মোবাইল খুললেই মিলবে শত শত বছরের প্রাচীন পুঁথি ও তালপাতার পাণ্ডুলিপি। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জ্ঞান ভারতম’ মিশনের উদ্যোগে ডিজিটাল রূপ পাচ্ছে দেশের অমূল্য পাণ্ডুলিপির ভাণ্ডার। আর সেই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে পূর্ব বর্ধমানও।এবার অ্যাপেই দেখা যাবে প্রাচীন পুঁথি, ডিজিটাল রূপ পাচ্ছে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। ভারতবর্ষ প্রাচীন সভ্যতা, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন ও সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। যুগ যুগ ধরে তালপাতা, তুলোট কাগজ ও হাতে লেখা পুঁথিতে সংরক্ষিত হয়েছে ধর্ম, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অমূল্য নিদর্শন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সব পাণ্ডুলিপির অনেকই নষ্ট হয়েছে, আবার বহু মূল্যবান পুঁথি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত সংগ্রহ, মঠ, মন্দির ও গ্রন্থাগারে।
এই অমূল্য ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতেই কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের উদ্যোগে শুরু হয়েছে ‘জ্ঞান ভারতম মিশন’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ডিজিটাইজ করা হচ্ছে। ফলে খুব শীঘ্রই মোবাইলে ‘জ্ঞান ভারতম’ অ্যাপ খুললেই সাধারণ মানুষ ও গবেষকরা দেখতে পারবেন বহু দুর্লভ পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি। জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত দেশের ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে ১ কোটি ২২ লক্ষ ২ হাজার ৪৪৫টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ডিজিটাইজ করা হয়েছে। সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার ৬৭২টি পাণ্ডুলিপি ডিজিটাল সংরক্ষণের আওতায় এসেছে। এই কাজে সহযোগিতা করছে এশিয়াটিক সোসাইটি, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগার। দেশজুড়ে প্রায় ৪৫টি কেন্দ্র ও ২০টি রাজ্য নোডাল অথরিটি এই প্রকল্পে কাজ করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধার, অনুবাদ ও সংরক্ষণও করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলা। জেলার লাইব্রেরি দফতরের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে প্রাচীন তালপাতার পুঁথি ও হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পাণ্ডুলিপি ডিজিটাইজ করা হয়েছে। কাটোয়া মহকুমা বৈষ্ণব সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শ্রীচৈতন্যদেবের দীক্ষাস্থান কাটোয়া, কেতুগ্রামে রয়েছে কৃষ্ণদাস কবিরাজের জন্মভিটে ও মহাপ্রভুর বিশ্রামতলা। তাই মহকুমার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব সাহিত্য, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল এবং কাশীরাম দাসের মহাভারতের বহু দুর্লভ তালপাতার পুঁথি। কাটোয়ার শ্রীখণ্ড চিত্তরঞ্জন পাঠমন্দির গ্রন্থাগারে দীর্ঘদিন আলমারির উপর অবহেলায় পড়ে থাকা বহু প্রাচীন পুঁথি উইপোকার আক্রমণে নষ্ট হচ্ছিল। সেখান থেকে ইতিমধ্যেই ১৭টি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করে ডিজিটাইজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষীরগ্রামের মা যোগাদ্যা মন্দিরের সংগ্রহশালা থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৩০টি তালপাতার পাণ্ডুলিপি। কাটোয়া ট্রেজারি থেকে চারটি এবং কেতুগ্রামের ঝামটপুরে কৃষ্ণদাস কবিরাজের বাড়ি থেকেও একাধিক মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা হয়েছে।
কাটোয়া মহকুমা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের এসডিআইসিও সুষ্মিতা মুখোপাধ্যায় জানান, জ্ঞান ভারতম মিশনের কাজ মহকুমাজুড়েই সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। কারও কাছে যদি কোনও প্রাচীন পুঁথি বা তালপাতার পাণ্ডুলিপি থাকে, তবে তা প্রশাসনকে জানিয়ে সংরক্ষণের কাজে সহযোগিতা করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের গবেষক ও লেখক শ্যামসুন্দর বেরা বলেন, ইতিহাসকে জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এই প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এতদিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংরক্ষিত বহু মূল্যবান ঐতিহ্য এবার কেন্দ্রীয় উদ্যোগে ডিজিটাল মাধ্যমে সুরক্ষিত হচ্ছে। এতে গবেষণার নতুন দিগন্ত যেমন খুলবে, তেমনি আগামী প্রজন্মও মোবাইলের একটি অ্যাপ থেকেই নিজেদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।