নিজস্ব প্রতিনিধি, মহম্মদবাজার: ফিরল ‘অপা’-র স্মৃতি! তৃণমূল জমানায় শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছিল কোটি কোটি টাকা ও সোনা। সেই ‘গুপ্তধনে’র বহর টেলিভিশনের পর্দায় দেখে চমকে গিয়েছিল রাজ্যবাসী। এবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বীরভূমে। তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্ট ঘনিষ্ঠ পাথর ব্যবসায়ীর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার হল একাধিক ব্যাগভর্তি বান্ডিল বান্ডিল নগদ ও ছোটো-বড়ো মিলিয়ে অন্তত ২৪টি সোনার বিস্কুট। সব মিলিয়ে যার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বুধবার ভোরে ‘বালি মাফিয়া’ তথা বীরভূমের পাথর সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট মহম্মদ নিজামউদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়িতে হানা দেয় জেলা পুলিশ। সূত্রের খবর, দিনভর চলা সেই ম্যারাথন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে নগদ প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সঙ্গে ১৫ কেজি সোনার বিস্কুট। রাত পর্যন্ত টাকা গোনা চলছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক শোরগোল পড়েছে রাজ্যজুড়ে। দুপুরেই এক্স হ্যান্ডেলে এই অভিযানের কথা জানিয়ে পুলিশের প্রশংসা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। এও লিখেছেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিকে মূলমন্ত্র রেখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। যিনি রাষ্ট্রের সম্পদ শোষণ করে এবং তৎকালীন শাসকদলের সঙ্গে সখ্য রেখে সম্পত্তি বানিয়েছেন, তাঁকে রেয়াত করা হবে না।’
এদিন ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ মহম্মদবাজারের দেউচায় ১৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে অবস্থিত মিনারের বাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ। শুরু হয় ডাকাডাকি। ভিতর থেকে সাড়া না মেলায় শেষমেশ দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকেন তদন্তকারীরা। এরপর আলমারি খুলতেই বেরিয়ে আসে একাধিক ব্যাগভর্তি ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিল এবং কাপড়ে মোড়া বিপুল পরিমাণ সোনার বিস্কুট। সকালের আলো ফুটতেই কৌতূহলী সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়ির দোরগোড়ায় উপচে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী। শুরু হয় টাকা গোনার প্রক্রিয়া। পরিস্থিতি অনুধাবন করে বড়ো বড়ো পাঁচটি ট্রাঙ্ক ও টাকা গোনার যন্ত্র আনা হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, মিনার এক সময় সরকারি বাসের চালক ছিলেন। কয়েক বছর আগে অবসর নেন। তারপর তিনি টুলুর পাথর কারবার সামলাতে শুরু করেন। তিনি আপাত নিরীহ, সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তদন্তকারীদের অনুমান, নিজের বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ও সোনা নিরাপদে রাখতে বিশ্বাসভাজন এই আত্মীয়ের ঘরকে ‘সেফ হাউস’ হিসাবে ব্যবহার করতেন টুলু মণ্ডল।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, প্রথমে গৃহ শিক্ষকতা এবং পরে পাথর সরবরাহের ব্যবসা দিয়ে জীবন শুরু টুলুর। বীরভূম জেলা তৃণমূলের ‘বেতাজ বাদশা’র আশীর্বাদের হাত মাথায় পড়তেই তিনি ফুলেফেঁপে ওঠেন। নামে-বেনামে বেআইনি খাদান, ক্রাশার চালানো থেকে জেলাজুড়ে রয়্যালটি ফাঁকির যাবতীয় চক্র ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে। সঙ্গে তৃণমূল জমানায় পুরো পাথর বলয়ের প্রশাসনিক চেকগেটগুলির অলিখিত দায়িত্বও। ইডি, সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় সংস্থা তাঁর কারবারে হানা দিয়েছিল। কিন্তু, অজ্ঞাত কারণে তদন্ত থমকে যায়। তবে পালাবদল হতেই টুলুর আর্থিক সাম্রাজ্যের শিকড় উপড়ে ফেলতে সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রশাসন। চলতি মাসের শুরুতেই মহম্মদবাজারে একাধিক ডেরায় হানা দিয়ে ১৬ লক্ষ কিউবিক ফুট বেআইনি বালি বাজেয়াপ্ত করে ভূমিদপ্তর। দায়ের হয় এফআইআর। সেই আঘাতের পরই জেলা পুলিশের এই সার্জিকাল স্ট্রাইক।