হাওড়া স্টেশনে একটি আট মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটছেন এক তরুণী। তাঁকে দেখেই সন্দেহ হয় স্টেশনে কর্মরত পুলিশ কর্মীদের। শিশুটিকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন? তরুণীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন পুলিশ কর্মীরা। তরুণীর কথা শুনে ও যাবতীয় তথ্য প্রমাণ দেখে অবাক সকলেই। শিশুটিকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা নয়, শিশুটিকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন ওই তরুণী। আদতে পাচারকারী এক মহিলার খোঁজ করছিলেন তিনি।
না, এটা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। দু’দিন আগে বাস্তবে এই ঘটনা ঘটেছে হাওড়া স্টেশনে। শিশুটিকে উদ্ধার করে দুর্গাপুরে নিয়ে এসে তাঁর মা বাবার হাতে তুলে দেন ওই তরুণী। তবে এই প্রথম নয়, দুর্গাপুরে কোক-ওভেন থানার অধীন বীরভানপুর গ্রামের তেঁতুলবাগান এলাকার বাসিন্দা শিল্পী পাল এর আগেও একাধিক শিশু ও নাবালিকাকে পাচারের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন। প্রায় ৫৫টি বাল্য বিবাহ রুখেছেন।
দুর্গাপুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় প্লাস্টিকের খালি বোতল কুড়িয়ে সামান্য কিছু পয়সা রোজগার করেন শিশুটির মা-বাবা। স্থানীয় সিনেমাহল রোডের পাঞ্জাবি পাড়ায় তাঁদের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই আছে ঠিকই। কিন্তু অধিকাংশ দিন প্লাস্টিকের বোতল কুড়ানোর জন্য খোলা আকাশের নীচে দিন কাটান তাঁরা। গত ২২ তারিখ থেকে নিখোঁজ ছিল শিশুটি। দুর্গাপুর স্টেশনের জিআরপির মাধ্যমে খবর পান শিল্পী। খোঁজ খবর করে জানতে পারেন শিশুটিকে পাচারের উদ্দেশে সেকেন্দ্রাবাদ নিয়ে গিয়েছেন এলাকার এক মহিলা পরিযায়ী শ্রমিক ছবি বাউড়ি। ছবির মেয়ের বিয়ে হয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলার মানকরে। মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন শিল্পী। মেয়ের মাধ্যমে সেকেন্দ্রাবাদে ছবি বাউড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেন শিল্পী। প্রথমে শিশুটিকে নিয়ে আসার কথা অস্বীকার করে ছবি। পরে অবশ্য স্বীকার করে।
ছবির মেয়ে তাঁর মাকে ফোন করে শিশুটিকে ফেরত দিতে বলে। না হলে মা ও মেয়ে, দু’জনকে আইনি জটিলতায় পড়তে হবে। বলা হয়, ঠাঁই হতে পারে শ্রীঘরে। মেয়ের কথায় ঘাবড়ে গিয়ে শিশুটিকে ফেরত দিতে রাজী হয় ছবি। কিন্তু শর্ত দেয় কোনও ভাবেই পুলিশকে সঙ্গে আনা যাবে না। এরপর শিশুটিকে নিয়ে ট্রেনে করে গতকাল হাওড়া আসেন ছবি। শিল্পী বলেন ‘নির্দিষ্ট একটি জায়গায় শিশুটিকে রেখে সরে যায় ছবি বাউড়ি। শিশুটিকে উদ্ধার করে তাঁর খোঁজ করছিলাম। তখনই আমাকে স্টেশনে কর্মরত পুলিশ কর্মীরা আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সমস্ত ঘটনা শোনার পর প্রয়োজনীয় নথি দেখেন পুলিশ কর্মীরা। তারপরে তাদের সন্দেহ দূর হয়। পুলিশ প্রথমে সন্দেহ করেছিল আমি বাচ্চাটাকে চুরি করে পালানোর চেষ্টা করছি। পরে বুঝতে পারে বাচ্চাটিকে আমি উদ্ধার করেছি।’
এই কাজে শিল্পীকে সাহায্য করেছে দুর্গাপুর জিআরপি। হাওড়া স্টেশন থেকে বাচ্চাটিকে আনতে যাওয়ার সময় সঙ্গে একজন কনস্টেবলকে দেওয়া হয়েছিল। আজ ভোরে বাচ্চাটিকে দুর্গাপুরে নিয়ে আসে তাঁর মা বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়। শিল্পী বলেন , ‘স্টেশন চত্বরে এমন অনেক লোকজন আছে যারা প্লাস্টিকের বোতল ও কাগজ কুড়িয়ে জীবীকা নির্বাহ করেন। এদের কারও সরকারি পরিচয়পত্র নেই। যার জন্য এই বাচ্চাটির ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ করতে সমস্যা হয়। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ এইসব লোকেদের জন্য যদি পরিচয়পত্র তৈরি করে দেওয়া হয়।’ তবে শিল্পীর এই কাণ্ডে খুশি শিশুটির মা-বাবা।