• দুবাই-সুইৎজ়ারল্যান্ড, চোরাপথে প্রায় ২২ কোটি সোনা মিনারের বাড়িতে
    এই সময় | ৩১ জুলাই ২০২৬
  • হেমাভ সেনগুপ্ত, সিউড়ি

    এক কেজি ওজনের সোনার বার ১৪টি। বাকি ১০টি বারের প্রতিটির ওজন ১০০ গ্রাম। এই ১৫ কেজি অর্থাৎ প্রায় ২২ কোটি টাকা দামের এই সোনা দুবাই ও সুইৎজ়ারল্যান্ড থেকে চোরাপথে আনা হয়েছিল বলে প্রাথমিক ভাবে পুলিশ জেনেছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, বীরভূমের মহম্মদবাজারের ডেউচায় মহম্মদ মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া সোনার বারগুলির গায়ে থাকা ছাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেগুলির কিছু দুবাই, কিছু সুইৎজ়ারল্যান্ডের। তা ছাড়া, সোনার বারগুলির গায়ে কেমিক্যালযুক্ত ব্ল্যাক টেপ লাগানো। যাতে শুল্ক দপ্তরের স্ক্যানারকে ফাঁকি দেওয়া যায়।

    পুলিশের দাবি, বুধবার রাতে মিনারের বাড়িতে পাওয়া প্রায় ২২ কোটি টাকা দামের ওই সোনা ও নগদ সাড়ে ২৮ কোটি টাকা যে মিনারের আত্মীয় ও বীরভূমের বালি ও পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজ়িবুদ্দিনের, সে ব্যাপারে যাবতীয় নথি মিলেছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সেই সব নথিও। পুলিশের দাবি, ধৃত মিনার মণ্ডল স্বীকার করেছে, ওই টাকা ও সোনা টুলু মণ্ডলের।

    বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সিউড়ির সুভাষপল্লি, সিউড়ির নহোদরি গ্রাম ও মহম্মদবাজারের সোঁৎশালে টুলু মণ্ডলের তিনটি বাড়ি ও মহম্মদবাজারের পার্কিং লটে চলছে তল্লাশি। মিনারকে এ দিন সকালে গ্রেপ্তার করা হয়। পলাতক টুলুর বিরুদ্ধেও এফআইআর করা হয়েছে। টুলুর বিরুদ্ধে যাতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও লুকআউট নোটিস জারি হয়, তার জন্য তৎপর হয়েছে পুলিশ।

    প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, দুবাইয়ে আশ্রয় নেওয়া টুলুর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর মেয়েও। গত ২৩ মে দেশ ছেড়ে পালানোর আগে ওই বিপুল পরিমাণ নগদ ও সোনা নিজের বাড়িতে না–রেখে টুলু তাঁর আত্মীয় ও সিন্ডিকেটের সহকারী মিনারের বাড়িতে রেখে যান। মঙ্গলবার রাতে ডেউচায় মিনারের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর জন্য গিয়ে পুলিশ ডাকাডাকি শুরু করলেও তাদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পরে পুলিশ দরজা ভেঙে ওই বাড়িতে ঢোকে। পুলিশ সূত্রের খবর, মিনারের বাড়িতে তল্লাশির খবর পেতেই দুবাই থেকে ফোনে টুলু মণ্ডল সিউড়ি এলাকার নহোদরি গ্রামে তাঁর বাগানবাড়িতে থাকা যাবতীয় নথি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। বৃহস্পতিবার সকালে নহোদরি গ্রামে একটি এসইউভি–কে আটকায় পুলিশ। তার ভিতরে ছিল বস্তা। বস্তার মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসে একটার পর একটা ফাইল। সেগুলির সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে প্রচুর সংখ্যক ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিপ্ট)–ও। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পরে পুলিশ জেনেছে, ওই ফাইলগুলিতে রয়েছে টুলুর পাথর ব্যবসার নথি।

    নহোদরি গ্রামের রতন ঘোষ, অর্ণব ঘোষের মতো স্থানীয়দের বক্তব্য, টুলুর বাড়ি থেকে গাড়ি বেরোতে দেখে তাঁরাই প্রথম সেটিকে আটকান, তার পরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, টুলুর ওই বাগানবাড়িতে থাকেন সুজিত বর্মন। তিনি জানিয়েছেন, গাড়িতে ফাইলপত্র তিনিই তুলে দিয়েছিলেন। টুলুর ম্যানেজার পার্থসারথি ঠাকুর স্বীকার করেছেন, ‘সকালে ফোন আসে। সাহেব (টুলু) বলেন, তোমার কাছে অফিসের কাগজ রয়েছে? ওগুলো সরিয়ে দাও। গাড়িতে রেখে দাও। ওই ফাইলে ট্রাকের কাগজ, চালান, খাতা, পাথর বিক্রির কাগজপত্র রয়েছে।’

    এ দিন সকালে সিউড়ির সুভাষপল্লিতে টুলুর বাড়িতে পৌঁছয় পুলিশ। চারতলা ওই বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসিতার যাবতীয় আয়োজন। বাড়িতে লিফ্‌ট, জিম। দামি আসবাবে সুসজ্জিত প্রতিটি ঘর। সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিলাসবহুল গাড়ি। সেখানে তল্লাশি অভিযানের সময়ে হাজির ছিলেন ডিএসপি (ডিইবি) সুরজিৎ মণ্ডল, ডিএসপি (সদর) সৌরভ ভট্টাচার্য, সিউড়ি থানার আইসি শৈলেন্দ্র উপাধ্যায়। মহম্মদবাজারের সোঁৎশাল গ্রামে টুলুর বাড়িটিও বিশাল। সূত্রের খবর, সোঁৎশালে টুলুর পৈতৃক বাড়ি। গ্রামে ঢোকার মুখেই উঁচু পাঁচিলে ঘেরা চারতলা সাদা বাড়ি। অভিযোগ, ওই বাড়ি টুলু মণ্ডল তাঁর যাবতীয় দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন টুলু।

    পাশাপাশি, টুলু মণ্ডলের আর এক ম্যানেজার, কাউসার মোল্লার মহম্মদবাজারের বাড়িতেও পুলিশ তল্লাশি শুরু করেছে। তদন্তে অসহযোগিতা করার অভিযোগে কাউসারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। কাউসারের বাড়িতে এবং তাঁর মালিকানাধীন একটি অনুষ্ঠান ভবনে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত তল্লাশি চলে।

    সূত্রের খবর, টুলু মণ্ডলের আর্থিক লেনদেনের হিসেব রয়েছে একটি ট্যাক্স কনসালট্যান্ট সংস্থার পরিচালক, সুরুলের সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। সেই খবর পেয়ে এ দিন বৃহস্পতিবার বোলপুরের সুরুলে সুরজিতের বিলাসবহুল বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশের একটি দল। তদন্তকারীরা সেখান থেকে কিছু কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করেছেন।

    সিউড়ির এসিজেএম আদালতে এ দিন বিকেলে বাজির করানো হয় টুলুর আত্মীয় মহম্মদ মিনার মণ্ডলকে। বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি বিভাস চক্রবর্তী জানান, মিনারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা টুলু মণ্ডল ২৩ মে দেশ ছেড়ে পালানোর আগে রেখে যান। তা ছাড়া, ওই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রচুর নথি মিলেছে, যার সবই হদিশ দিয়েছে টুলু মণ্ডলের বিভিন্ন সম্পত্তির। সরকারি কৌঁসুলি জানান, উদ্ধার হওয়া কাগজ মূলত পাথর খাদানের নথি, টাকা কোথায় রাখা হয়েছে তার নথি এবং গাড়ির কাগজ। সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য, টুলু মণ্ডল সিন্ডিকেট রাজ চালু করেছিলেন— বিশাল এলাকা জুড়ে জোর করে টাকা তোলা, সরকারি জমি দখল, লুটপাট, ভয় দেখিয়ে জমি দখল করা ছিল ওই সিন্ডিকেটের কাজ। টুলুর ওই সিন্ডিকেটে মিনার তাঁর যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের দাবি। মিনারকে বিচারক ৮ দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন।

    তদন্তে উঠে এসেছে, মহম্মদবাজার থেকে শুরু করে মুরারই, নলহাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ব্যাসল্টের খনি থেকে গোটা রাজ্যে, ভিন রাজ্যে, এমনকী বাংলাদেশেও পাথর সরবরাহের অন্যতম নিয়ন্ত্রক এই টুলু মণ্ডল। খনি থেকে পাথর প্রথমে পৌঁছয় ক্রাশারে, যেখানে বিভিন্ন মাপে পাথর ভাঙা হয়। ক্রাশার থেকে লরি ভর্তি হয়ে সেই পাথর যায় বিভিন্ন জায়গায়। তদন্তকারীদের একাংশের বক্তব্য, টুলুকে এড়িয়ে একটা লরিও ক্রাশার থেকে পাথর নিয়ে বেরোতে পারে না।

    কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘টুলু মণ্ডলের আত্মীয়ের কাছে যদি এই পরিমাণ টাকা থাকে, তা হলে টুলু মণ্ডলের কাছে কত আছে? যে এক সময়ে দিনমজুর ছিল, সে দেড়শো কোটি টাকা খরচ করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে।’ তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। এ দিন অনুব্রতর বক্তব্য, ‘আমার প্রসঙ্গ যারা তুলছে তারা ভুল করছে। টুলু মণ্ডলকে গোটা বীরভূম জেলার মানুষ চেনে। ওর সবার সঙ্গে ভাব রয়েছে। আমার নামে কেন উঠছে কী করে জানব? তার জন্যই মানহানির মামলা করব। কাউকে ছাড়ব না।’ তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের মুখপাত্র, বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এ বারের ভোটে কেউ এই টাকা (টুলু মণ্ডলের টাকা) ব্যবহার করেছে কি না, তার তদন্ত হোক।’

  • Link to this news (এই সময়)