প্রতি বছর ২৯ জুলাই সারা বিশ্বে সাড়ম্বরে পালিত হয় আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস (International Tiger Day)। কিন্তু কতটা নিরাপদে রয়েছে বাঘেরা? ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, ভারতে বাঘের আনুমানিক সংখ্যা ৩,৬৮২টি। বিগত বছরগুলির তুলনায় বাঘের সংখ্যা বাড়লেও শার্দুল প্রজাতি কিন্তু এখনও IUCN-এর 'Endangered' (বিপন্ন) তালিকায় রয়েছে। বনভূমি ধ্বংস ও বাঘেদের আবাসস্থল কমে যাওয়া ও অবৈধ শিকার এদের সংরক্ষণের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
তবে বাঘেদের সংরক্ষণকে আরও বাড়াতে ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এক অভিনব প্রকল্প নিয়ে এসেছে আলিপুর জুলজিক্যাল গার্ডেন বা আলিপুর চিড়িয়াখানা।
অনেক পশুপ্রেমী মানুষেরই ইচ্ছে থাকে একটি বাঘের যাবতীয় দায়িত্ব বহন করা। তাদের প্রজাতিকে বছরের পরে বছর সংরক্ষণ করা। সেই সুবাদে অনেকেই বাঘ দত্তক নিতে চান। কিন্তু বাঘ তো আর বাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানা (Alipore Zoological Garden) এমন একটি সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে আপনি একটি বাঘের অভিভাবক হতে পারবেন। কী ভাবে সম্ভব এটি?
আলিপুর চিড়িয়াখানা রয়েছে ‘Animal Adoption Programme’। যার মাধ্যমে আর্থিক ভাবে আপনি একটি বাঘের সব দায়িত্ব নিতে পারবেন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে একটি বাঘের খাবার, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন পরিচর্যার সব খরচ বহন করতে পারেন। যে কোনও ব্যক্তি বা কোনও সংস্থা—উভয়েই এই উদ্যোগে সামিল হতে পারবেন।
কী ভাবে আপনি একটি বাঘকে দত্তক নিতে পারবেন?
এই পুরো প্রকল্পটি আলিপুর চিড়িয়াখানার ‘Animal Adoptation Programme’ -এর আওতায় পড়ে। এটি একটি ফস্টার বা স্পনসরশিপ প্রকল্প। শুধু বাঘই নয়, আলিপুর চিড়িয়াখানার যে কোনও প্রাণীকে আপনি দত্তক নিতে চাইলে এই প্রকল্পের আওতায় আপনাকে নথিভুক্ত হতে হবে। এই প্রকল্পে কোনও প্রাণীকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যায় না। বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রাণীটির রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় সব খরচ আপনি বহন করতে পারবেন।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ কী কী ভাবে ব্যবহার করা হয়?
অনেকের মনেই হয়তো জাগছে তা হলে কী ভাবে এই প্রকল্পের জন্য অর্থ দিতে হয়? প্রতিটি প্রাণীর জন্য দত্তক নেওয়ার অর্থ আলাদা।
বাঘ দত্তক নিতে কত টাকা লাগে?
আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে বাঘ দত্তক নেওয়ার জন্য মাসিক ও বার্ষিক আপনি দু’ভাবে অর্থ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে
আপনি নিজের সুবিধামতো মাসিক বা বার্ষিক—যে কোনও একটি পরিকল্পনা বেছে নিতে পারবেন।
সবাই কি বাঘ দত্তক নিতে পারেন?
সাধারণত এই প্রকল্প সকলের জন্য। এই ‘Adoptation Programme’-এ সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও কোনও সংস্থা বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও সামাজিক সংগঠন—সকলেই আবেদন করতে পারেন।
কী কী নিয়মে বাঘ দত্তক নেওয়া হয়?
তবে এই প্রকল্পে বাঘ বা যে কোনও প্রাণী দত্তক নেওয়ার জন্য আপনাকে মানতে হবে কয়েকটি বিশেষ নিয়ম।
প্রথমে আলিপুর চিড়িয়াখানার অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি ০৩৩-২৪৭৯১১৫০ বা +৯১ ৬২৯২৩৩৬৬৮০ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। এ ছাড়াও West Bengal Zoo Authority-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে ই-মেলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারবেন।
আলিপুর চিড়িয়াখানার ডেপুটি ডিরেক্টর ডক্টর পিয়ালী চক্রবর্তী জানিয়েছেন, বাঘ দত্তক নেওয়ার জন্য যাবতীয় তথ্য https://kolkatazoo.in/web/adopt/ ওয়েবসাইট থেকে পেয়ে যাবেন আবেেদনকারীরা।
এরপর আপনাকে নির্বাচন করতে হবে স্পনসরশিপের মেয়াদ। অর্থাৎ আপনি কতদিন এই স্পনসরশিপ চালাতে চান, তা নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আপনি মাসিক ও বার্ষিক মাসিক স্পনসর নিতে পারেন।
দত্তক নেওয়ার জন্য কী কী তথ্য প্রয়োজন?
আবেদন জমা দেওয়ার জন্য আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা, যোগাযোগের যাবতীয় তথ্য জমা দিতে হয়। কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের যাবতীয় যোগাযোগের তথ্য ও প্রয়োজনীয় লোগো (যদি প্রযোজ্য হয়) প্রয়োজন। পাশাপাশি, আবেদন করার জন্য নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরই আপনার আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে। দত্তক নেওয়ার পরে আপনি বা আপনার প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে স্পনসর হিসেবে।
চিড়িয়াখানায় কোথায় দেখা যাবে স্পনসরের নাম?
আলিপুর চিড়িয়াখানায়—
• Enclosure 68 – Bengal Tiger Enclosure
• Enclosure 34 – White Tiger Open Reserve
এই দুই এনক্লোজারের বাইরের বোর্ডে স্পনসর বা দত্তক গ্রহণকারীদের নাম প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়াও https://kolkatazoo.in/web/adopt-adopter.php ওয়েবসাইটেও যারা দত্তক নিয়েছেন তাঁদের নাম, অর্থের পরিমাণ দেওয়া রয়েছে।
দত্তক নেওয়ার জন্য কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি:
এই উদ্যোগের গুরুত্ব কী?
বর্তমানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাঘ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ তাদের সংখ্যা বাড়ানো ও নিরাপদে রাখার জন্যই এই উদ্যোগ।
FAQ (Frequently Asked Questions)
আলিপুর চিড়িয়াখানায় কি বাঘ দত্তক নেওয়া যায়?
হ্যাঁ। আলিপুর চিড়িয়াখানার 'Animal Adoption Programme'-এর মাধ্যমে বাঘ দত্তক নেওয়া যায়। তবে এটি শুধুমাত্র আর্থিক স্পনসরশিপ।
আলিপুর চিড়িয়াখানায় বাঘ দত্তক নিতে কত টাকা লাগে?
বাঘ দত্তক নেওয়ার জন্য বার্ষিক স্পনসরশিপের খরচ ২.৫ লক্ষ টাকা এবং মাসিক স্পনসরশিপের খরচ ২০ হাজার টাকা।
কারা বাঘ দত্তক নিতে পারেন?
সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী, কর্পোরেট সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই প্রকল্পে অংশ নিতে পারে।
দত্তক নেওয়ার পর সেই অর্থ কী কাজে ব্যবহার করা হয়?
দত্তক নেওয়ার পর বাঘের খাবার, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা, ভেটেরিনারি পরিষেবা, পরিচর্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হয়।
কী ভাবে আলিপুর চিড়িয়াখানার 'Animal Adoption Programme'-এ আবেদন করবেন?
আলিপুর চিড়িয়াখানার অফিসে যোগাযোগ করে বা West Bengal Zoo Authority-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। আবেদনকারীকে মাসিক বা বার্ষিক স্পনসরশিপের মেয়াদ বেছে নিতে হয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হয়।