বিড়ালই সূত্র! ৮ বছরের শিশুর রহস্যময় রোগের সমাধান
আজকাল | ৩১ জুলাই ২০২৬
গোপাল সাহা: বাড়ির পোষ্য বিড়ালের সূত্র ধরেই চিকিৎসায় সাফল্য এল আট বছরের শিশুর চিকিৎসায়। আবার বাড়ির সেই পোষ্য বিড়ালই হয়ে উঠল শিশুর অসুখের প্রধান কারণ। দক্ষিণ কলকাতার এক আট বছরের শিশুকে খিঁচুনি নিয়ে বাইপাসের এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। চিকিৎসকরা প্রথমে রোগের কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সূত্র মিলল বাড়ির পোষ্য বিড়ালের কাছেই।
হাসাপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, শিশুটি আগে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল। জীবনে প্রথমবারের খিঁচুনি হওয়ায় তাকে পরিবারের লোকেরা ওই বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। শুরুতে এটি একটি বিচ্ছিন্ন স্নায়বিক সমস্যা বলে মনে হলেও, খুব দ্রুত তা ‘স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস’ (এটি এক ধরনের বিরল প্রজাতির রোগ, যা বিড়ালের আঁচড়ের কারণে শিশুদের হয়ে থাকে)-এ পরিণত হয়। এটি এমন একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যেখানে খিঁচুনি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে বা রোগী জ্ঞান ফিরে পাওয়ার আগেই বারবার খিঁচুনি হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন শিশুটিকে একাধিক অ্যান্টি-সিজার ওষুধ দেওয়া সত্ত্বেও খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে শিশুটিকে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (PICU)-এ স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে নজরদারিতে রাখা হয়, শ্বাসনালিতে টিউব প্রবেশ করিয়ে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়।
জানা গিয়েছে, খিঁচুনি শুরু হওয়ার আগে শিশুটির জ্বর ছিল না। তার পূর্বে কোনও স্নায়ুরোগের ইতিহাসও ছিল না। পরিবারে মৃগী রোগের কোনও নজির ছিল না এবং সে নিয়মিত কোনও ওষুধও খেত না। ফলে তার শারীরিক পরিস্থিতি চিকিৎসকদের বিস্মিত করে। তবে ধীরে ধীরে দু’টি আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন উপসর্গ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। খিঁচুনির প্রায় ১০ দিন আগে শিশুটির পায়ে হালকা গোলাপি রঙের র্যাশ দেখা দিয়েছিল এবং তার বাঁ বগলের নীচে একটি লসিকাগ্রন্থি (লিম্ফ নোড) অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গিয়েছিল। ওই বেসরকারি হাসপাতালের বহুবিভাগীয় চিকিৎসক দল সংক্রমণ ও অটোইমিউন রোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন এবং পাশাপাশি ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকও চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার পর করা ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাম (EEG)-এ দেখা যায়, শিশুটি ‘নন-কনভালসিভ স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস’-এ ভুগছে। অর্থাৎ বাইরে থেকে খিঁচুনি না দেখা গেলেও মস্তিষ্কে খিঁচুনি চলছিল। এরপর অবিলম্বে আরও অ্যান্টি-এপিলেপটিক ওষুধ দেওয়া হয়।
মস্তিষ্কের এমআরআই ও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) পরীক্ষায় কোনও স্পষ্ট সংক্রমণের কারণ ধরা পরেনি বলেই জানিয়েছে চিকিৎসকরা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির জ্বরও আসে। তাকে অ্যান্টিবায়োটিক, কর্টিকোস্টেরয়েড এবং ইনট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন দেওয়া হয়, পাশাপাশি মূল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলতে থাকে। প্রথমদিকে, চিকিৎসকরা যক্ষ্মা আক্রান্ত কোন ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা, অপরিশোধিত দুধ পান, সাম্প্রতিক ভ্রমণ বা কোনও প্রাণীর কামড়ের ইতিহাস পাননি। পরে জানা যায়, শিশুটি বিড়াল অত্যন্ত পছন্দ করত এবং পরিবারের একটি পোষ্য বিড়াল নিয়মিত তার সঙ্গে খেলা করত ও একই বিছানায় ঘুমাত। এরপর চিকিৎসকদের মনে সন্দেহ জাগে ‘ক্যাট-স্ক্র্যাচ ডিজিজ’-এর কথা, যা বার্টোনেলা (Bartonella) প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। রক্তের নমুনা পাঠানো হয় বার্টোনেলা অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য। যদিও পরীক্ষার রিপোর্ট শিশুটি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর হাতে আসে। তবুও সেটি চিকিৎসকদের সন্দেহকেই সত্য প্রমাণ করে। অর্থাৎ এই শিশুটি এই বিরল রোগ 'স্ট্যাটাস এপিলেপ্টিকাস' এ আক্রান্ত ছিল। তবে এই রোগের পরীক্ষা রাজ্যে বা দেশের সব জায়গায় হয় না। যার রিপোর্ট আসতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ দিন। ঘটনার মোড় ঘুরে যায় পরিবারের সদস্যদের বারবার ও বিস্তারিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর। চিকিৎসকরা জানতে পারেন কী কারনে এমন ঘটনা ঘটেছে! ওই শিশুর মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বেশ কিছুদিন আগে বাড়ির পোষ্য বিড়ালের সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে বিড়ালটি আঁচড় দিয়েছিল। সেখান থেকেই এ ধরনের সংক্রমণের সূত্রপাত। এরপরেই চিকিৎসকরা রোগের ধরন দেখে শিশুটির চিকিৎসা শুরু করেন।
‘স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস’ এই বিরল প্রজাতির রোগের উপসর্গ কী কী- • প্রথমে এই আচরের জায়গায় একটি ফুসকুড়ির মত ফুঁলে যায় বা গোটা হয়। • এরপর সেখান থেকে বগলের তলার লাল হয়ে ফুলে যায়।• এছাড়াও গলার গ্ল্যান্ড বা অন্যান্য গ্ল্যান্ড ও ফুলে উঠতে পারে। • সঙ্গে বমি ভাব, হালকা জ্বর, গা গুলানো, শরীর দুর্বল লাগা, ঠোট শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এই ধরনের সিমটম দেখা যায়। • পরবর্তীতে গুরুতর খিচুনি ওঠে, মৃগী রোগীর মত। যার কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ একেবারেই কমে যায়। এর ফলে স্নায়বিক রোগ বা মস্তিষ্কে গুরুতর রোগ হতে পারে। • এর কারনে গুরুতর স্নায়বিক জরুরি অবস্থা তৈরি হয়, যা ৫ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে খিঁচুনি, অথবা পরপর খিঁচুনি হয় এবং সংজ্ঞা বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
প্রসঙ্গত, বিড়ালের আঁচড় থেকে এই রোগ এক বিরল প্রজাতির রোগ। এ ধরনের রোগের বহিঃপ্রকাশ দেশের অন্য প্রান্তে বা এই রাজ্যে দেখা যায়নি বলেই দাবি চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের। খাতায় কলমে বিরল রোগের আওতায় না পড়লেও, এই রোগকে এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিরল বলা যেতে পারে বলেই জানিয়েছেন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা। এই রোগের ক্ষেত্রে, বাড়ির পোষা বিড়াল থেকে সচেতন থাকা জরুরী। আঁচড় বা কামড় লাগলে প্রাথমিকভাবে সেই জায়গাটা সঙ্গে সঙ্গে সাবান জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা উচিত, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চিকিৎসার পর শিশুটির অবস্থার ক্রমশ উন্নতি হতে থাকে। জ্বর কমে যায়, পুনরায় করা EEG-তে খিঁচুনির কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে ওষুধের মাত্রাও কমানো হয় এবং প্রায় পাঁচ দিন পর ভেন্টিলেটর খুলে নেওয়া সম্ভব হয়। বগলের ফুলে যাওয়া লিম্ফ নোড উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যায়, ত্বকের র্যাশ মিলিয়ে যায় এবং শিশুটি সম্পূর্ণ স্নায়বিক সুস্থতা ফিরে পায়। প্রায় ১০ দিন হাসপাতালে থাকার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শিশুটি বাড়ি ফিরে গিয়েছে।
হাসপাতালের শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শুভ্রাংশু শেখর সরকার আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে বলেন, “এই শিশুর পূর্বে কোনও তেমন রোগ ছিল না। সুস্থই ছিল আট বছরের শিশুটি। আমরা বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, কেন এমন রোগ হল। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও রোগ নির্ণয় সম্ভব হচ্ছিল না, যতক্ষণ না পরিবারের পোষ্য বিড়ালের সঙ্গে শিশুটির খেলার বিষয়টি সামনে আসে। যদিও বিড়ালের আঁচড় (ক্যাট-স্ক্র্যাচ ডিজিজ) সাধারণত নিরীহ সংক্রমণ, তবুও বিরল ক্ষেত্রে এটি রিফ্র্যাক্টরি স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাসের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিড়াল আঁচড় দিয়ে সেখানে বাটর্নেলা হেনসেলি বলে একটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত হয়। তার ফলে ওই আঁচরের জায়গা থেকে একটু ফুলে যাওয়ার আকার ধারণ করে। যা পরবর্তীতে এই রোগের আকার নেয়। এটি এক ধরনের বিরল রোগ, যা বিড়ালের আঁচড় থেকে বা কামড়ানো থেকে হতে পারে। এই ধরনের রোগ কুকুর থেকে হয় না। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে সচেতন থাকাটা খুব জরুরি। আঁচড় বা কামড় লাগলে সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গাটা যেন সাবান জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় সেদিকে নজর রাখা। আর এটা বাচ্চাদের ক্ষেত্রেই সংক্রমণটা হয়ে থাকে। তাই যে কোন রোগ নিরাময়ের জন্য তার পূর্বের ইতিহাস জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে পোষ্য বিড়াল থেকে সচেতন থাকাটা খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।”