• ক্লাসে ‘ভূতে’র ভয়! সন্দেশখালির স্কুলে পরপর ছাত্রীদের অসুস্থতায় ঘনীভূত রহস্য
    প্রতিদিন | ০১ আগস্ট ২০২৬
  • স্কুলের মধ্যে রহস্য! ‘ভূতে’র ভয়ে ক্লাসের মধ্যে একের পর এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কারও মাথা ঘোরা, কারও শ্বাসকষ্ট, আবার কেউ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই ঘটনায় সন্দেশখালির একটি স্কুলে মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকার একাংশে ‘ভূতের ভয়’ নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তবে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানমঞ্চের প্রতিনিধিরা ঘটনাটিকে গণ-মানসিক প্রতিক্রিয়া (Mass Psychogenic Illness) বা অন্য কোনও পরিবেশগত কারণ খতিয়ে দেখতে পরামর্শ দিয়েছেন।

    বসিরহাটের সন্দেশখালি ১ নম্বর ব্লকের রাজবাড়ী এলাকার ফুলমনি আদর্শ বিদ্যামন্দির। এখানেই গত তিনদিন ধরে ছাত্রীরা ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। শুক্রবার স্কুলে ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ একের পর এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করে। প্রথমে ২৫ জন ছাত্রীকে স্থানীয় রাজবাড়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের মিনাখাঁ গ্রামীণ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা স্কুলে ভিড় জমান। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশও। পরপর একই ধরনের ঘটনা ঘটায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং স্থানীয়দের মধ্যে। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, গত তিনদিন ধরেই অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রী একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। সেই সময় অসুস্থ কয়েকজন ছাত্রী এবং স্থানীয়দের একাংশের দাবি ছিল, ‘ভূতের ভয়ে’ আতঙ্কিত হয়ে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এই গুজব ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

    শুক্রবার ঘটনার খবর পেয়ে স্কুলে যান সন্দেশখালির বিধায়ক সনৎ সর্দার। এলাকায় পর্যাপ্ত অ্যাম্বুল্যান্স না থাকায় তিনি নিজের গাড়িতে করেই কয়েকজন অসুস্থ ছাত্রীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন। বিধায়কের অনুমান, টানা বৃষ্টির জেরে স্কুল চত্বর স্যাঁতসেঁতে হয়ে বিশ্রী গন্ধ তৈরি হয়েছে, যা সহ্য করতে না পেরে অনেক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতে পারে। বিধায়কের নির্দেশে স্কুলের চারপাশে ব্লিচিং পাউডার ছড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। তবে কেন শুধুমাত্র ছাত্রীরাই আক্রান্ত হল, তার উত্তর চিকিৎসকেরাই দিতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক চন্দ্র শেখর মিস্ত্রি জানান, অতীতেও একবার একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। গরমের দিনে লোডশেডিংয়ের সময় কয়েকজন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন চিকিৎসকরা গ্যাসের প্রভাব অথবা ‘প্যানিক অ্যাটাকে’র আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, আতঙ্ক নয়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমেই প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব।

    পরপর একই ঘটনা ঘটায় বসিরহাট স্বাস্থ্য জেলার উপ-মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ শ্যামল কুমার বিশ্বাসও এদিন স্কুলে যান। তিনি জানান, মোট ৩২ জন ছাত্রী অসুস্থ হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দু’জনকে পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁর অনুমান, ছাত্রীদের মধ্যে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা গণ-মানসিক প্রতিক্রিয়ার ঘটনাই ঘটেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য কাউন্সিল সদস্য প্রদীপ্ত সরকারও। তাঁরও বক্তব্য, ঘটনাটিকে ‘অতিপ্রাকৃত’ বলে ব্যাখ্যা করার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং কোনও রাসায়নিক গ্যাসের প্রভাব, খাবারজনিত সমস্যা বা অন্য কোনও পরিবেশগত কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একজনের তীব্র মানসিক আতঙ্ক অন্যদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গণ-মানসিক প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও মত প্রদীপ্তবাবুর।
  • Link to this news (প্রতিদিন)