• ‘ঠুঁটো’ অপবাদ ঘুচল অদম্য জেদে, পায়ে লিখেই ১২ বছর ধরে শিক্ষকতা বাঘমুন্ডির জগন্নাথের!
    প্রতিদিন | ০১ আগস্ট ২০২৬
  • বিদ্যার দেবীর কাছে হাতেখড়ির সময়ে বাঁ পায়ে চক নিয়েই পুরোহিতের সাহায্যে লিখেছিলেন অ-আ! তারপর শৈশব, কৈশোর, যৌবন পার করে ওই পায়ে লিখেই চাকরি পেয়েছেন। আর এখন সেই বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল ও তার পাশের আঙুলের মাঝে ধরা মার্কার পেনেই ক্লাসে অঙ্ক করান ব্ল‍্যাকবোর্ডে। এমনকী, ছবি এঁকে পাঠ দেন পরিবেশ বিজ্ঞানেরও!

    জন্ম থেকেই তাঁর দু’হাত নেই। ঠাকুরদা ‘ঠুঁটো জগন্নাথের’ সঙ্গে মিল পেয়ে তাই নাতির নাম রেখেছিলেন জগন্নাথ। কিন্তু সেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকেই হেলায় উড়িয়ে ঠুঁটো অপবাদ কার্যত মিথ্যা প্রমাণ করে ছেড়েছেন তিনি। ১২ বছর ধরে পা দিয়েই ব্ল‍্যাকবোর্ডে লিখে, খাতা দেখে দিব্যি পড়ুয়াদের কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন মাস্টারমশাই। জগন্নাথ মাহাতো। পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের বুড়দা-কালিমাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাভা-তোরাং নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়ান তিনি।

    ৪১ বছরের এই প্রাথমিক শিক্ষকের বাড়ি ওই বুড়দা গ্রামেই। জন্ম থেকেই তিনি বিশেষভাবে সক্ষম। এভাবে পায়ের দুই আঙুলের মাঝে কলম দিয়ে লেখার ভাবনা মাথায় এল কীভাবে? শিক্ষক জগন্নাথ জানান, “আমরা পাঁচ ভাই-বোন। যখন দিদিরা পড়তে বসে কলম নিয়ে লিখত, তখন আমার বয়স ৪-৫ বছর। সেই সময় আমি বাঁ পায়ের দুই আঙুলের মাঝে কলম নিয়ে নিই। যা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল দিদিরা। ওই ভাবেই আমাকে তারা লিখতে উৎসাহ দেয়। আমার মনের মধ্যে তখন সে যেন এক যুদ্ধ! মনে হয়েছিল, যখন আমি পায়ে কলম ধরতে পেরেছি, তখন আমি লিখতেও পারব। পারলাম।”  

    ছেলেবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়া স্বপ্ন ছিল সেই জগন্নাথের। শিক্ষক দিবসের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তর যখন সেরা শিক্ষক খুঁজতে তালিকা তৈরি করছে, তখন কিন্তু নেহাতই প্রচারের আড়ালে প্রতিবন্ধকতা জয়ী এই শিক্ষক জগন্নাথ। বুড়দা বিবেকানন্দ শিশু মন্দির থেকে প্রাথমিক পাঠ। বুড়দা হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক। উচ্চ মাধ্যমিক ঝালদা সত্যভামা বিদ্যাপীঠে। পুরুলিয়া শহরের জে কে কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে বিধাননগরে মৎস্য দপ্তরে চাকরি। কিন্তু বাড়ি থেকে কর্মস্থল দূরে হওয়ায় সেই চাকরি ছেড়ে দেন।

    ২০১২তে টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি পান। চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া শেফালি মাছুয়ার ও সুরজ সিং মুড়া প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকেই দেখছে জগন্নাথ মাস্টারমশাইকে। ওদের কথায়, “তখন মাস্টারমশাইকে পায়ে লিখতে দেখে অবাক লাগত। আর এখন যখন উনি কিছুতেই হার না মানার কথা বলেন, তখন ওঁকে দেখেই তার মানে বুঝতে পারি।” স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিৎ কুমার বলেন, “আমার স্কুলের শিক্ষক জগন্নাথবাবু সত্যিই উদাহরণ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে কোনও বাধা নয়, তা তিনি প্রমাণ করছেন। আর সেটাই শিখছে পড়ুয়ারা।”
  • Link to this news (প্রতিদিন)