বিএড কলেজের রমরমা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রছাত্রীরা, ক্ষুব্ধ কলকাতা হাইকোর্ট
eTV Bharat | ০১ আগস্ট ২০২৬
কলকাতা, 1 অগস্ট: রাজ্যে বিএড কোর্স করানোর নামে রমরমিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে বেসরকারি কলেজগুলি ৷ এনিয়ে চরম ক্ষোভপ্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট ৷ কলেজগুলি ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার মান নিয়ে আদৌ কতটা চিন্তিত, সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত ৷
বিভিন্ন জেলায় বেসরকারি কলেজগুলিতে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে যাওয়ার প্রায় বছরখানেক পরও ভর্তি নেওয়া হচ্ছে ৷ এদিকে প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম একশো দিনের ক্লাস না-হওয়ার কারণে সেইসব নতুন পড়ুয়াদের পরীক্ষায় বসতে দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় ৷ শনিবার এই সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতরকে তদন্তের নির্দেশ দিলেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা ৷
নির্দেশে জানানো হয়েছে, উপযুক্ত আধিকারিকদের নিয়ে তদন্তকারী দল গঠন করবে উচ্চশিক্ষা দফতর ৷ সেই দল বেসরকারি বিএড কলেজগুলির কর্মকাণ্ড তদন্ত করে দেখবে ৷ পাশাপাশি 'ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন' (এনসিটিই) কর্তৃপক্ষকেও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি ৷ আগামী 1 অক্টোবর আদালতে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে ৷ ইতিমধ্যে যে ছাত্রছাত্রীরা প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষায় বসতে পারছেন না, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে, যেন তাঁদের ভবিষ্যত নষ্ট না-হয় ৷ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে হবে জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা ৷
এদিন বিচারপতি চরম ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, "কীসের জন্য টাকা দিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা ? টাকা দিয়ে কোর্স করবে, তারপর চাকরি পাবে না, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে ৷ এই তো অবস্থা ? সেমেস্টার শুরু হয়েছে গত বছর জুলাই মাসে ৷ আর ছাত্রছাত্রী ভর্তি চলছে এবছরের মে মাসেও ? শিক্ষাবর্ষের প্রায় 75 শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে ৷ তারপর অগস্ট মাসের প্রথম সেমেস্টারে পরীক্ষায় বসার অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন ! বিশ্ববিদ্যালয়ের, এনসিটিই-র কোনও রকম নজরদারির ব্যবস্থা নেই !"
প্রেক্ষাপট
কবিগুরু নোবেল সেন্টেনারি কলেজের 2025-27 শিক্ষাবর্ষের বিএড কোর্সের দু'জন পরীক্ষার্থী কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন ৷ এই কলেজটি বাবা সাহেব আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ । কলেজে বিএড কোর্সে কিছু আসন ফাঁকা থাকায় চলতি বছরের মে মাসে ফের ভর্তি নেওয়া হয় ৷
গত 25 জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল ৷ মামলাকারীরা 2025-27-এর জন্য সেই ফর্ম ফিলাপ করে ৷ এদিকে পরীক্ষায় বসার জন্য যে কোনও প্রার্থীর অন্তত একশো দিনের ক্লাস করা বাধ্যতামূলক ৷
এদিকে প্রার্থীরা মে মাসে ভর্তি হয়েছেন ৷ ফলে তাঁদের একশো দিনের ক্লাস হয়নি ৷ তাই আদালতে মামলাকারীদের আর্জি ছিল আপাতত পরীক্ষা স্থগিত রাখা হোক ৷ কলেজের বক্তব্য, ওই ছাত্রদের অতিরিক্ত ক্লাস দেওয়া হয়েছিল ৷ কিন্তু একশো দিনের ক্লাস হয়নি ৷
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবীর বক্তব্য: ছাত্ররা জানতেন, তাঁদের একশো দিনের ক্লাস হবে না ৷ আর তা জেনেই তাঁরা কলেজে ভর্তি হয়েছেন ৷ তাঁদের পরের বার পরীক্ষা দেওয়া উচিত ৷
বিচারপতি অমৃতা সিনহা: নিয়মিত নজরদারি হয় না ৷ অ্যাকাডেমিক সেশনের 75 শতাংশ হয়ে যাওয়ার পর এঁরা ভর্তি হন কীভাবে ? কলেজ অনলাইন অ্যাডমিশন চালিয়ে গিয়েছে ।
কবিগুরু নোবেল সেন্টেনারি কলেজের আইনজীবীর বক্তব্য, "ভর্তি না নিলে শিক্ষকদের স্যালারি দিতে পারবে না ৷"
বিচারপতি অমৃতা সিনহা বলেন, "এর থেকেই বোঝা যায় কলেজ মোটেও এই ছাত্রদের পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখে না ৷ পড়ার মান কতটা ভালো, সে নিয়ে সন্দেহ আছে ৷"
মামলাকারীরা আদালতে আর্জি জানান, অগস্ট মাসের পরীক্ষা আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হোক ৷ কিন্তু কলেজের আপত্তির কারণে বিচারপতি জানিয়েছেন, "পরীক্ষা আপাতত চলবে ৷ তবে এই ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা করে ব্যবস্থা করুক ৷"
একইভাবে পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো বিএড কলেজ নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে ৷ কলেজের অ্যাফিলিয়েশন বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ৷ ইতিমধ্যে ওই কলেজে ভর্তি হওয়া এক বিএড পরীক্ষার্থী মে মাসে দশ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়ার পর এখন প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষায় বসতে পারছেন না ৷ তাই তিনিও কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন ৷
এনসিটিই'র তরফে আইনজীবী এদিন আদালতে জানিয়েছেন, মামলাকারী কলেজের ওয়েবসাইট দেখে তারপর 'অ্যাডমিশন ফি' জমা দিয়েছেন ৷ এনসিটিই-র ওয়েবসাইট দেখে তিনি ওই কলেজে ভর্তি হননি ৷ ওই কলেজ নিয়ে যে একাধিক মামলা রয়েছে, সেটা তার জানা উচিত ছিল ৷ এনসিটিই কার্যত দায় ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছে ৷
বিচারপতি অমৃতা সিনহা কলেজের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এনসিটিইকে হলফনামা দিয়ে জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন ৷ অর্থাৎ ওই কলেজের স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা দিয়ে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ তার এক সপ্তাহের মধ্যে মামালকারী তার বক্তব্য জানাবে ৷