• কথায় কথায় ‘ঢপের কেত্তন’ বলেন, বাংলায় সত্যিই এমন কীর্তন ছিল, জানেন কী?
    এই সময় | ০২ আগস্ট ২০২৬
  • গৌতম ধোনি, কৌশিক ভট্টাচার্য

    তিলকে তাল করা বাঙালির স্বভাব। পেটেন্ট নেওয়া ‘কুটিরশিল্প’ বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হয় না। সাধে কি আর ঘনাদা, টেনিদা, ব্রজদাদের এত রমরমা! সৈয়দ মুজতবা আলির ঢঙে বললে, ফরাসি দেশে এঁদের বলে ‘দ্য গুল’, বিলেতে ‘গুলিস্ট’, রাশিয়ায় ‘গুলাকভ’, নেদারল্যান্ডসে ‘গুলিট’, আর আমাদের পোড়া দেশে ‘গুলজারিলাল’।

    বাঙালির গুলমোহরে তাই ঢপ, ঢপবাজের আলাদা কদর। বরাবর। গোরু এখানে শুধু গাছে উঠেই ক্ষান্ত হয় না। মরা কুমীরের পেটে জলজ্যান্ত বাজার পর্যন্ত বসিয়ে দিতে পারে। বিশ্বাস না হলে ত্রৈলোক্যনাথের ‘ডমরুচরিত’ খুলে বসুন। মাগুরমাছের ছটফটানি দেখে ভূমিকম্পের আন্দাজ পাওয়া তো নস্যি। আর যারা এ সবে অবিশ্বাস করে, তারা নেহাতই বদনসিব। কেন?

    দেখুন মশাই, বাঙালি এ যাবৎ কাল শুধু ঢপ দেয়নি। মহা ধুমধাম করে ঢপের কেত্তনও গেয়ে এসেছে। আজ্ঞে হ্যাঁ। কীর্তন বলতেই, রাধা-কৃষ্ণের ভজন মনে পড়ল তো! ওটা নয়। আবার পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়াও যায় না। ঢপ বড়ই গোলমেলে জিনিস। আষাঢ়ে গপ্প ফাঁদা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। এখন যদি তার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার ফুল, বেলপাতা ছেটানো হয়, তখন সেটা আর ঢপ থাকে না, হয়ে যায় ‘প্রসাদ’। হুঁ হুঁ বাওয়া...।

    গুণীজনেরা বলেন, বাংলায় নাকি কীর্তনের চার রকমের ঘরানা রয়েছে। রেনেটি, গড়াণহাটি, মনোহর সাই বা মনোহরশাহি এবং ঝাড়খন্ডি। এর মধ্যে মনোহরশাহি ঘরানারই দপদপানি বেশি। ঢপের কীর্তনের কাদা, মাটি, খড়, বাঁশ এই মনোহরশাহিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক, যার জনপ্রিয়তা বেশি, তার ঘাড়েই তো বন্দুক রাখা হবে।

    ‘কীর্তনের’ মতো এমন একটা আঙ্গিকের সঙ্গে ‘ঢপ’ জুড়ে দেওয়ার কাজটা ‘ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস’ বলে চিল্লিয়ে ওঠা বাঙালি ছাড়া আর কার পক্ষেই বা সম্ভব! নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব অবশ্য এতটা চাঁচাছোলা হতে রাজি নন। তাঁর কথায়, ‘সহজ-সরল লৌকিক ধারার কীর্তন গানই ঢপের কেত্তন।’

    আজ থেকে একশো বছর আগেও তো মনোরঞ্জন মানে ছিল পাড়ার মনসাতলা। গুডুক গুডুক তামাক টানার সঙ্গে চলত গুল-গপ্পো। আর ছিল কীর্তন। কিন্তু সেখানে তো আর সবাই যেতেন না। একটু ভক্তি-টক্তি আছে, ঠাকুরের নাম-গান শুনলে চোখে জল আসে যাঁদের, তাঁরাই ভিড় করতেন। শান্তিরঞ্জন বলছেন, ‘শাস্ত্রীয় কীর্তনের ব্যাকরণ কিছুটা এড়িয়ে, হালকা চালে কথকথার ঢঙে সবার কাছে পৌঁছে যাওয়াই ছিল এর লক্ষ্য।’

    আর এই ঢপের কীর্তনের আদিপুরুষ হলেন রূপচাঁদ পক্ষী। আসল পদবি দাস মহাপাত্র। বাঙালি নন, ওডিয়া। তাঁর বাবা কর্মসূত্রে কলকাতায় থাকতেন। রূপচাঁদেরও বেড়ে ওঠা এই শহরেই। আর গান বাঁধার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। রেল, বিধবা বিবাহ, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা — সাবজেক্ট পেলেই হলো।

    রূপচাঁদ অনায়াসে লিখে ফেলতে পারতেন, ‘আমি তারে সার্চ করি/ শ্রীমতী রাধার কেনা সারভেন্ট/ এই দেখ আচে দাসখত এগ্রিমেন্ট/ এখনই করব প্রেজেন্ট, ব্রজপুরে লব ধরি...’। দুরন্ত রসবোধ আর শব্দচয়নে দক্ষতা না থাকলে যে এই জিনিস হয় না, তা আর বুঝিয়ে বলতে হবে না নিশ্চয়।

    তবে ‘ঢপের কীর্তন’-এর জনক হিসেবে রূপচাঁদ অধিকারীর নাম নিচ্ছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সুজয়কুমার মণ্ডল। ১৭২২-এ মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় তাঁর জন্ম। আদি বাড়ি কান্দিতে। সুজয়ের কথায়, ‘তিনিই মনোহরশাহি কীর্তনকে ভেঙেচুরে ঢপের কেত্তন হিসাবে চালু করেছিলেন।’ আরও সহজ, আরও লৌকিক, আরও জনপ্রিয়। এই ফিল্ডে আর একজনের নামও পাওয়া যায়। তিনিও ঢপের কীর্তনের ওস্তাদ, যশোরের মধুসূদন কিন্নর। তবে তাঁর বিষয়ে বিশদে কিছু জানা যায় না।

    বাঙালি রসিকও। রূপসাগরের সঙ্গে রসসাগরে ভেসে যাওয়াতেও তার নেইকো মানা। না হলে শ্রাদ্ধে ঢপের কীর্তন গাওয়া হয়? ভাবুন, মৃতের ছবিতে মালা ঝোলানো, ধূপ-ধুনো জ্বলছে। তার সামনে খোল-কর্তাল নিয়ে রূপচাঁদ পক্ষীর ঢঙে নেচে নেচে ঢপের কীর্তন গাইছেন কয়েক জন। লোকসঙ্গীতের জগতে বাংলা ব্যান্ড ‘দোহার’- তুলনা তারা নিজেরাই। ব্যান্ডেরই সদস্য জয়শঙ্কর বলছেন, ‘হ্যাঁ, শ্রাদ্ধ বাসরে ঢপ কীর্তন হতো। মনে হয়, দুঃখ কমাতেই এমন আয়োজন থাকত।’ কষ্ট ভোলার দাওয়াই বটে!

    বাঙালি যে ঢপ অন্ত প্রাণ, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘ঢপওয়ালির মোড়’। নবদ্বীপের প্রাণকেন্দ্র পোড়ামাতলার কাছে একটা রাস্তার নাম। ভাবা যায়! ঢপের ঠিকানা! এত পর্যন্ত পড়ে যদি কেউ ভাবেন, ঢপ মারায় মহিলারা পিছিয়ে তা হলে, আপনি ঢাহা ফেল। পিতৃতন্ত্র এখানে কলকাঠি নাড়ার সুযোগ পায়নি। এই মোড়ের নামই তার প্রমাণ।

    ঢপের কেত্তন জগতের অবিসংবাদী নায়িকা কীর্তনীয়া ক্ষান্তমণি দাসী। তাঁর আদি বাড়ি ছিল পূর্ব বর্ধমানের পাটুলি। কীসের টানে যেন চলে এসেছিলেন নবদ্বীপে। প্রতি সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে ঢপ গানের আসর বসত। পুরাতত্ত্ব পরিষদের শান্তিরঞ্জনের কথায়, ‘ক্ষান্তমণির মৃত্যুর পরে তাঁর বাড়ির পাশের রাস্তাটাই ঢপওয়ালির মোড় নামে পরিচিতি পায়।’

    ঢপের কীর্তন গাওয়ার খুব ইচ্ছা গায়িকা পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের। লোকসঙ্গীত থেকে কীর্তন, সবেতেই তিনি সমান সাবলীল। আধুনিক গানেও। পৌষালীর নিজের কথায়, ‘অনেক রকমের কীর্তন গেয়েছি। কিন্তু ঢপের কীর্তন কোনও দিন গাইনি। গাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে।’ এক সময়ে জমিদার বাড়িতে ঢপের কীর্তনের আসর বসত বলে শুনেছেন পৌষালী, ‘কালের নিয়মে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এখন তো ঢপ মানে মিথ্যা।’ সেই চাকাটা ঘুরিয়ে দিতে চান দোহারের জয়শঙ্কর, ‘আমি চাই, কীর্তনের এই ধারা আবারও বাংলা সঙ্গীতের মূলস্রোতে ফিরে আসুক।’ এমনটা হলে, বাঙালি যে দুই হাত তুলে স্বাগত জানাবে তাতে সন্দেহ নেই কোনও।

    অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তো বটেই, বিংশ শতাব্দীতেও কিন্তু ঢপের কীর্তনের তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল। বছর তিরিশেক আগেও নাকি শোনা যেত এই গান। নবদ্বীপের বিশিষ্ট কীর্তন শিল্পী গৌরী রায় পণ্ডিত বলছেন, ‘কিশোরী বেলায় ওই আঙ্গিকের গান শুনেছি। তবে এখন আর কেউ আছেন বলে জানা নেই।’ ঢপের গান না শোনার আক্ষেপ এখনও রয়েছে নবদ্বীপেরই আর এক বিশিষ্ট কীর্তন শিল্পী সুরণজিৎ ভট্টাচার্যের। তিনি বলেন, ‘আমি কৃষ্ণ লীলা, গৌরাঙ্গ লীলা গাই। ঢপের কীর্তনের নাম শুনেছি। শোনার সুযোগ হয়নি।’

    একটু মিথ্যে, তার সঙ্গে খানিক রং, দু’চামচ বাড়িয়ে বলা, আধ কাপ কল্পনা আর একেবারে শেষে এমন এক চমক, শ্রোতা হাঁ হয়ে যাবে। এ জিনিস একমাত্র বাঙালিই পারে। জাপানি কুস্তি সুমোর পয়জারে ধরাশায়ী বেনিটো যখন মাটিতে পড়ে গোঙাচ্ছে, তখন ঘনাদা কী বলেছিলেন মনে আছে তো? ‘সবই শিখেছো, শুধু এই বাংলা কাঁচিটাই শেখোনি।’

  • Link to this news (এই সময়)