এই সময়, বালুরঘাট: চার দশক ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কখনও পাহাড়, কখনও মরুভূমি, কখনও জঙ্গলের দুর্গম চৌকি। উৎসবে পারিবারিক আনন্দ কিংবা ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে ছিল একটাই পরিচয়, দেশের প্রহরী। সেই দীর্ঘ অধ্যায় শেষে নিজের গ্রামে ফিরলেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ডিএসপি পদমর্যাদার অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক সুভাষচন্দ্র শীল। আর তাঁর এই ঘরে ফেরা যেন এক ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন নয়, গোটা গ্রামের গর্বের দিন।
রবিবার সকালে দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর ব্লকের ফুলবাড়ি নাকর এলাকায় তাঁকে ঘিরে ছিল উৎসবের ছবি। ফুলবাড়ি বাজার থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রায় বাজল ব্যান্ড, উঠল 'ভারত মাতা কি জয়' ধ্বনি। ফুলের মালায় গ্রামের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন সুভাষ। গ্রামের প্রবীণ থেকে তরুণ-সকলেই যেন তাঁদের 'নিজের মানুষ'-কে বরণ করে নিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন উত্তম মহন্ত, নিতাই রায়, নীরেন বসাক, তপন বসাক, বকুল মণ্ডল-সহ এলাকার বিশিষ্টরা।
১৯৮৬-র ১৭ অক্টোবর কনস্টেবল পদে বিএসএফ-এ যোগ দিয়েছিলেন সুভাষ। নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও কর্মদক্ষতার জোরে ধাপে ধাপে উঠে পৌঁছেছিলেন ডিএসপি পদমর্যাদায়। কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কাটে ত্রিপুরার আগরতলায় ৩৩ ব্যাটেলিয়নের সদর দপ্তরে। দীর্ঘ চাকরিজীবনে রাষ্ট্রপতি পদক-সহ একাধিক সম্মান পেয়েছেন তিনি। কিন্তু রবিবার গ্রামের মানুষের ফুলের মালা যেন তাঁর কাছে মনে হয়েছে অনেক বড় সম্মান। আবেগ চেপে রাখতে পারেননি সুভাষ। তাঁর কথায়, 'দেশের সেবা করার সুযোগ পাওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তবে নিজের গ্রামে ফিরে মানুষের এত ভালোবাসা পাব, ভাবিনি।'
এই দীর্ঘ পথচলার নেপথ্যে ছিল অপেক্ষার আর এক গল্প। স্ত্রী শিখা ও পরিবারের সদস্যদের কাছে তাঁর চাকরির প্রতিটি দিনই ছিল উদ্বেগের। সীমান্তে কর্মরত স্বজনের নিরাপদে ফেরার সেই অপেক্ষা শেষ হলো রবিবার। শিখার কথায়, 'আজকের এই সম্মান আমাদের পরিবারের কাছেও অত্যন্ত গর্বের।' গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে সুভাষ কেবল অবসরপ্রাপ্ত এক বিএসএফ আধিকারিক নন, তিনি আগামী প্রজন্মের কাছে দেশসেবার অনুপ্রেরণা। তাই তাঁর ঘরে ফেরা উপলক্ষে আয়োজন ছিল সংবর্ধনার, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল কৃতজ্ঞতার। সীমান্তে কাটানো চার দশকের ঋণ হয়তো শোধ করা যায় না, তবে শ্রদ্ধা জানানো যায়। ফুলবাড়ি নাকরের মানুষ রবিবার সেটাই করলেন।