প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
গ্রাম-টোলায় নজরদারি শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। ফলে জঙ্গলের গভীরে আত্মগোপন করে থাকলেও রান্না-বান্নার কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য সেই গ্রামগুলি এড়িয়ে বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানার হাটগুলি থেকে মাওবাদীরা কাঁচামাল সংগ্রহ করছে বলে গোয়েন্দাদের একটি অংশের দাবি। সূত্র মারফত এমন খবর পেয়ে বাংলার পুরুলিয়ার ঝাড়খণ্ড সীমানা লাগোয়া বান্দোয়ানের বিভিন্ন হাটে নজরদারি শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার ঝাড়খণ্ডের গিরিডি-ধানবাদ সীমানায় গ্রেপ্তার করা হয় সিপিআই মাওবাদী পলিটব্যুরো সদস্য মিসির বেসরা–সহ তাঁর আরও কয়েক জন সহযোদ্ধাকে। তিনিই মাওবাদী সংগঠনের শেষ জীবিত পলিটব্যুরো সদস্য। সূত্রের খবর, এই শীর্ষ মাওনেতাকে গ্রেপ্তারের পরে বাংলা, ঝাড়খণ্ড ও ওডিশা, এই তিন রাজ্যের পদস্থ পুলিশ কর্তাদের এক ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের লক্ষ্য কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশকে জালে তোলা।
২০১১–য় বাংলায় বাম সরকারের পরাজয়ের পর থেকেই রাজ্যের জঙ্গলমহলে ভেঙে যায় মাওবাদীদের সংগঠন। জঙ্গলমহলে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে যে সমস্ত মাওনেতা বা স্কোয়াড সদস্যরা ছিলেন, তাঁরা সীমানা পেরিয়ে ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে গা ঢাকা দেন। কেন্দ্রীয় সরকার দেশকে মাওমুক্ত করার কথা ঘোষণা করলে ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গনা, ওডিশা–সহ বিভিন্ন রাজ্যে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়। অনেক মাওনেতা আত্মসমর্পণ করেন, অনেকের মৃত্যুও হয়।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, এই আবহে মিসির ও আকাশ–সহ কয়েক জন ঝাড়খণ্ড-ওডিশা সীমানার সারান্ডার গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, সম্প্রতি সারাণ্ডার গোপন ডেরা ছেড়ে মোস্ট ওয়ান্টেড আকাশ ঝাড়খণ্ডেরই দলমা রেঞ্জের জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়েছে। এই দলে আকাশ ছাড়াও রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে সচিন, সাগর সিং ওরফে বীরেন, মদন মান্ডি ওরফে শঙ্কর, সমীর সরেন এবং জবা, মালতী, মীরা পাহারিয়ার মত স্কোয়াড সদস্যরা রয়েছেন বলে সূত্রের দাবি। জঙ্গলের গভীরে আত্মগোপন করলেও নির্দিষ্ট কোনও এক জায়গায় ঘাঁটি না করে দ্রুত তাঁরা নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছেন। পাশাপাশি বর্ষায় জঙ্গল আরও ঘন হয়ে যাওয়ায় এঁদের ডেরার হদিশ পাওয়া গোয়েন্দাদের পক্ষে আরও মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু একটাই অস্ত্র। খাবারের সন্ধানে জঙ্গল ছেড়ে বেরোতে হবে মাওবাদীদের। ফলে যে গ্রামগুলিতে মাওবাদীদের জনভিত্তি মজবুত ছিল, সেখানে গোয়েন্দারা নজরদারি শুরু করায় খাবারের জন্য মাওবাদীদের সীমানা লাগোয়া হাটগুলির উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে। তাই এ পারের আসনপানি, যুগিডি, কুচিয়া, দুয়ারসিনি, কাঁটাগোড়া–সহ সীমানার ও পারের হাটগুলির উপরেও নজরদারি শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে জঙ্গলের গভীরে যাঁরা বনজ সম্পদ সংগ্রহে যান, তাঁদের কাছেও খবর নেওয়া শুরু হয়েছে।
এই রাজ্যের বান্দোয়ান ছুঁয়ে থাকা সীমানার ও পারেই স্কোয়াডের অবস্থানের খবর এসেছে। তাই অতিরিক্ত সতর্ক রয়েছে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ। সীমানা লাগোয়া গ্রামগুলিতে টহলের পাশাপাশি জঙ্গলের বিভিন্ন রাস্তাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বান্দোয়ানের পুলিশ ক্যাম্পগুলিকেও সতর্ক করা হয়েছে। পদস্থ পুলিশ কর্তারা সরেজমিনে ক্যাম্পগুলিতে গিয়ে পরিকাঠামো খতিয়ে দেখেছেন। পুরুলিয়া জেলা পুলিশ সূত্রের খবর, জঙ্গলমহলে ফের কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠিও লেখা হয়েছে।