• চিতার ঘরেই চোরাশিকার! কুনোয় নিহত ১০ লেপার্ড, ধৃত হুব্বা-গব্বররা
    এই সময় | ০৩ আগস্ট ২০২৬
  • শিলাদিত্য সাহা

    চোরাশিকারের ছায়া এ বার চিতার ডেরায়।

    একটা নয়, দুটো নয়। কমপক্ষে ১০টি লেপার্ড মেরে তাদের চামড়া ছাড়িয়ে চালান করা হয়েছিল চোরাচালানকারীদের হাতে। আর সেই অকুস্থল আর কোথাও নয়, মধ্যপ্রদেশের কুনো! চার বছর ধরে এই এলাকাতেই বেড়ে উঠছে চিতার সংসার। বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশটি চিতা রয়েছে কুনোর জঙ্গলে। আর যে যে এলাকায় চোরাশিকারিরা ফাঁদ পেতে লেপার্ড শিকার করেছে, সেই কুনো ওয়াইল্ডলাইফ ডিভিশন, শেওপুর ও মোরেনা ফরেস্ট ডিভিশন— সবটা মিলিয়েই এই মুহূর্তে গড়ে উঠছে ভারতের চিতা ল্যান্ডস্কেপ। এই গোটা এলাকাতেই আন্তঃরাজ্য চোরাচালানকারীদের নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ জন চোরাশিকারিকেও। কারও নাম হুব্বা, কারও নাম গব্বর! এখনও পর্যন্ত কোনও চিতা চোরাশিকারের বলি হয়নি ঠিকই, তবে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন এ বার উঠেই গেল।

    মধ্যপ্রদেশ বন দপ্তর সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত ২৩ জুলাই উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় সাইয়ান এলাকা থেকে চার জন চোরাচালানকারীকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তাদের দু’জন হরিয়ানার, দু’জন মধ্যপ্রদেশের। তাদের থেকে ১০টি লেপার্ডের পূর্ণাঙ্গ চামড়া ও আরও দেহাংশ বাজেয়াপ্ত হয়। জেরায় জানা যায়, পড়শি মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল থেকে শিকার করে এগুলো আনা হয়েছে সম্ভবত দিল্লির কোনও খদ্দেরকে ডেলিভারি করার জন্য। তার পরেই তদন্তে যুক্ত হয় মধ্যপ্রদেশের টাইগার স্ট্রাইক ফোর্স। গত ৩০ জুলাই অভিযান চালিয়ে চিতার বিচরণভূমি শেওপুর ও মোরেনা জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরও সাত চোরাশিকারিকে। তাদের মধ্যে ৬ জন শেওপুরের, একজন মোরেনার বাসিন্দা। জঙ্গলের ভিতর থেকে উদ্ধার হয় অন্তত ৭টি লেপার্ডের হাড়গোড়। আজ, সোমবার তাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জেরার জন্য কোর্টে আপিল করতে চলেছেন টাইগার স্ট্রাইক ফোর্সের আধিকারিকরা।

    ২০২২–এর সেপ্টেম্বর থেকে তিন দফায় আফ্রিকা থেকে ভারতে চিতা উড়িয়ে আনা হয়েছে ২৯টি চিতা। দেশের মাটিতে জন্মানো ৩৩টি চিতাশাবকের ঘরও সেই কুনো। মুক্ত জঙ্গলে ঘোরা চিতাদের সবার গলায় রেডিয়ো কলার পরানো রয়েছে, তাদের মনিটরিং চলে নিয়মিত। তার ফাঁক গলে কী ভাবে এত বড় চোরাশিকারের নেটওয়ার্ক ছড়াল? টাইগার স্ট্রাইক ফোর্সের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, ‘আসলে চিতার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টাই করেনি চোরাশিকারিরা। এমনকী, চিতাদের আশপাশে যে সব লেপার্ডরা ঘোরাফেরা করে, তাদেরও শিকারের পরিকল্পনা ছিল না। কারণ চোরাশিকারিরা জানত, চিতার ক্ষেত্রে সব সময়ে ইলেকট্রনিক সার্ভেইল্যান্স এবং অনগ্রাউন্ড মনিটরিং চলে। তাই তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে জঙ্গলের পূর্বদিকের পাহাড়ি এলাকায় লেপার্ড মারার ফাঁদ পাতা হয়েছিল, যেখানে বেশ কিছু শ্যাডো এরিয়া (যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন) রয়েছে। মূলত চোরাচালানের মার্কেটে হঠাৎ লেপার্ডের চামড়ার ডিমান্ড তৈরি হয়েছিল কোথাও। তাই হাড়গোড় ওরা জঙ্গলে ছড়িয়ে ফেলে গিয়েছিল।’

    কুনোর চিফ কনজ়ারভেটর অফ ফরেস্ট (সিসিএফ) উত্তম শর্মার কথায়, ‘কুনোর ক্ষেত্রে চোরাশিকারিরা ওয়াইল্ডলাইফ ডিভিশন এলাকার বাইরে ৫০০–৬০০ মিটার দূরে ‘ক্যাটল ক্যাম্প’ চালাত। আর জঙ্গলের ভিতরে গবাদি পশুদের চরাতে (খিরকারী) নিয়ে যাওয়ার অনুমতি ছিল এদের কাছে। সেই এলাকায় ঘোরা লেপার্ড যখনই কোনও গবাদি পশুকে শিকার করত, চোরাশিকারিরা বেছে বেছে ঠিক সেখানেই ‘লেগ হোল’ মেটাল ট্র্যাপ পাতত। কারণ ওরা জানে, লেপার্ড একবারে গোটা শিকারকে খায় না, বার বার আসে। সেই ভাবেই মেটাল ট্র্যাপে পা দিয়ে ফাঁদে পড়ত লেপার্ড, তার পরে সে মারা পড়ত চোরাশিকারির হাতে।’ জানা যাচ্ছে, অন্তত ৬টি লেপার্ড মারা পড়েছে কুনোয়, ২টি শেওপুরে এবং ২টি মোরেনার চম্বল অভয়ারণ্য এলাকায়। যেহেতু লেপার্ডের চামড়া বিক্রি করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল, তাই ফাঁদে পড়া লেপার্ডকে চার–পাঁচ জন ঘিরে ধরে কাঠের তক্তা দিয়ে এমন ভাবে মারত যাতে সে জখম হয়ে মারা গেলেও চামড়াটি অক্ষত থাকে।

    তবে গ্রেপ্তার হওয়া চোরাশিকারিরা খুব সম্প্রতি এই কুকাজে যুক্ত হয়েছিল বলে মনে করছেন বনাধিকারিকরা। কারণ ঐতিহাসিক ভাবে শিকারি জনজাতি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীর (হান্টার ট্রাইবস) সদস্য এরা নয়, কারও বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধের রেকর্ডও এখনও পর্যন্ত মেলেনি। মনে করা হচ্ছে, লেপার্ডের চামড়ার চাহিদা তৈরি হওয়ার পরেই গত এক বছরে এরা লেগ হোল মেটাল ট্র্যাপ বানাতে ও ব্যবহার করতে শিখেছে। যেহেতু মধ্যপ্রদেশের এই অঞ্চলে জঙ্গলে পশুপালন খুবই পরিচিত পেশা, তাই আপাত ভাবে স্থানীয়রাও এদের সন্দেহ করেনি। সবার আড়ালে লেপার্ড মেরে চামড়া ছাড়িয়ে তারা সেগুলো পাচার করে দিয়েছিল উত্তরপ্রদেশে। আগ্রায় পুলিশের জেরায় ধৃতেরা মুখ খোলার আগে পর্যন্ত চোরাচালানের কুনো–কানেকশন সামনেও আসেনি।

    এখানেই মধ্যপ্রদেশ বন দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আরটিআই কর্মী অজয় দুবে। তাঁর কথায়, ‘চিতারা যে সুরক্ষিত নয়, সেটা তো এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। এত মনিটরিং থাকার পরেও তো নাকের ডগায় চোরাশিকার হয়েছে ১০টা লেপার্ডের। কুনোর বনকর্তারা এর দায় এড়াতে পারেন না।’ যদিও কুনোর সিসিএফ উত্তমের যুক্তি, ‘গত চার বছর ধরে সমস্ত প্রতিকূলতা মেনেই চিতা সংরক্ষণের কাজ করছেন বনকর্মীরা। মধ্যপ্রদেশ বৃহত্তর চম্বলের অংশ, যা ঐতিহাসিক ভাবে ডাকাতদের এলাকা। চম্বলে এককালে ফুলন দেবীও সক্রিয় ছিলেন। টাইগার স্ট্রাইক ফোর্স চোরাশিকারের ঘটনার তদন্ত করছে, কুনোর চিতাদের নিরাপত্তাতেও কোনও ফাঁক নেই।’

  • Link to this news (এই সময়)