এই সময়, কলকাতা ও হাওড়া: রাজ্যর পুর ও নগরোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাইকে কি পাকিস্তান থেকে ফোন করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল? না পাক মাদক চোরাচালানকারী শাহজ়াদ ভাট্টির গ্যাংয়ের নির্দেশে এ রাজ্যেরই কেউ মন্ত্রীকে হুমকি দিয়েছিল?
সেই রহস্যের কিনারা করতে হাওড়ার পিলখানা রোডে হামিম মণ্ডলদের কারখানা যেমন রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) নজরে রয়েছে, তেমনই কয়েক জনের নামও জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। সেই সূত্রেই উঠে আসছে ভাট্টির ডান হাত হিসেবে পরিচিত আবিদ জাটের নাম।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ভাট্টি গ্যাংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলো আবিদ। ক্রস-বর্ডার গ্যাংস্টার সিন্ডিকেট এবং ভাট্টির মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হ্যান্ডলার আবিদ পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে কাজ করে। গোয়েন্দাদের দাবি, এ হেন আবিদই ‘সেশন’ এবং ‘এলিমেন্ট এক্স’–এর মতো এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত হামিম এবং তাঁর প্রেমিকা অর্পিতা সরকারের সঙ্গে। সোশ্যাল মিডিয়ার মোড়কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ইনস্টলেশন, ভিভিআইপি-র মুভমেন্টের মতো ইনফর্মেশন অর্পিতা পাকিস্তানে পাঠাত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে হামিম এবং অর্পিতাকে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রের খবর।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, গত মে-তে উমেশ রাইকে ফোন করে খুনের হুমকি দিয়েছিল আবিদই। উমেশকে বলা হয়, তাঁর গতিবিধির খবর জঙ্গিদের কাছে রয়েছে, যে কোনও সময়ে খুন করা হতে পারে। এমনকী তাঁর ছেলেকে অপহরণের হুমকিও দেওয়া হয়। উমেশ পুলিশের দ্বারস্থ হলে উঠে আসে হামিম ও অর্পিতার যোগ। উমেশ বলেন, ‘গত মে-তে আবিদ জাট নামে এক ব্যক্তি আমাকে ফোন করে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাই।’
তদন্ত এবং জেরায় উঠে এসেছে হামিমের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ইঙ্গিতও। শাহজ়াদ ভাট্টি গ্যাংয়ের এক হ্যান্ডলার দুবাই থেকে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত বলে অনুমান করা হচ্ছে। সেই ব্যক্তিই আবিদ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামিমের কাছ থেকে কোনও পাসপোর্ট উদ্ধার হয়নি। ফলে বিদেশে তার যাতায়াত ছিল কি না, এখনও পরিষ্কার নয়।
সূত্রের খবর, হামিমের সঙ্গে অর্পিতার ঘনিষ্ঠতার সুযোগ পুরোদমে নিয়েছিল ভাট্টি গ্যাং। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘অ্যাক্টিভ’ অর্পিতাকে বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হতো বলে গোয়েন্দারা জেনেছেন। রিলস তৈরির অছিলায় পাক হ্যান্ডলার অর্পিতাকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিত বলে জানা গিয়েছে। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, বছর চারেক আগে ইনস্টাগ্রামে পরিচয় হামিম ও অর্পিতার। নিজেকে হাওড়ার ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছিল হামিম। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় বন্ধুত্বে এবং পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিণত হয়।
ঝাড়খণ্ডের সাহিবগঞ্জের বাসিন্দা অর্পিতা দুই বোনের মধ্যে ছোট। বাবা কৃষক, মা আইসিডিএস কর্মী। তবে কলকাতায় নিজের দাদু–দিদার কাছেই বেশিরভাগ সময় থাকত অর্পিতা। ছোটবেলা থেকেই মডেলিংয়ের শখ, মোটরবাইক চালানো তার নেশা। প্রায়ই বাইক নিয়ে ঘুরতে দেখা যেত তাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে সব পোস্টও রয়েছে।
হাওড়ার গোলাবাড়ি থানার অন্তর্গত পিলখানার সাত নম্বর আলম মিস্ত্রি লেনের ভাড়া নেওয়া হামিমের কারখানাও গোয়েন্দাদের স্ক্যানারে এসেছে। সেখানে জামাকাপড়ে ট্যাগ ও স্টিকার লাগানোর কাজ চলত। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই কারখানাকেই হামিম নিজের ঘাঁটি বানিয়েছিল কি না। জানা গিয়েছে, দু’বছর আগে পিলখানায় হামিমের বাবা মইনুদ্দিন মাসে ১১ হাজার টাকা ভাড়ায় দু’টি ঘর নিয়েছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে কয়েক জন কর্মী নিয়ে রেডিমেড পোশাকের ট্যাগ ও স্টিকার লাগানোর কাজ চলত। হামিমও মাঝেমধ্যে তদারকি করত। তবে সন্দেহজনক তেমন কিছু নজরে পড়েনি বলেই জানাচ্ছেন স্থানীয়দের একাংশ। এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, প্রায় আট-দশ মাস আগে গভীর রাতে একটি বড় মেশিন কারখানায় আনা হয়েছিল। ওই মেশিন, কারখানার নথিপত্র, কর্মীদের পরিচয়পত্র, আর্থিক লেনদেন এবং সব ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।