আজকাল ওয়েবডেস্ক: নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন রবিবার ভারতে 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি' বা 'ইউনিফর্ম সিভিল কোড' (ইউসিসি) চালুর বিষয়ে জোরাল সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহিলাদের প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য এ ধরনের আইন অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োজন এবং সবার জন্য সমান আইন থাকা উচিত।
প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় এসেছেন তাসলিমা। রবিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সেখানেই লেখিকা বলেন, "গত ৪০ বছর ধরে আমি 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি'-র জন্য লড়াই করছি। যেকোনও সভ্য দেশে এটা অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার। সবার জন্য সমান আইন থাকা উচিত। মহিলারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হন এবং 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি'-র মাধ্যমে তার অনেকটাই দূর করা সম্ভব। এটা অপরিহার্য।"
পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের জন্য একটি খসড়া অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পর্যালোচনার জন্য উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। তাই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি'-র পক্ষে সওয়াল করেন তাসলিমা নাসরিন। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনের "সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও বিশাল ব্যাপ্তি"-র কথা বিবেচনা করে এই প্যানেল গঠন করা হয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ করার আগে প্যানেল খসড়া বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে ৬৩ বছর বয়সী এই লেখিকা বলেন, "সমতাই হল সভ্যতার মূল ভিত্তি, অথচ অনেক মহিলা এখনও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশে হিন্দু মহিলাদের সমান অধিকার নেই। তাঁরা বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার পান না। হিন্দু মহিলারা যদি স্বাধীনতা ও সমান অধিকার ভোগ করতে চান, তবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োজন।"
২০০৭ সালে 'দ্বিখণ্ডিত' বইটির প্রকাশনা নিয়ে তৈরি বিক্ষোভের জেরে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তসলিমাকে কলকাতা ছাড়াতে বাধ্য করেছিল। তারপর প্রায় ১৯ বছর পেরিয়েছে। তারপর কলকাতায় ফিরে শনিবার রবীন্দ্র সদনে এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে সংবর্ধিনা দেন। ধর্ম নিয়ে তাঁর লেখা ও মতামতের জেরে মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার পর ১৯৯৪ সালে তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিলেন।
শনিবার তাঁর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৈরি বিশৃঙ্খলা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন লেখিকা তসলিমা। ওই অনুষ্ঠানে দর্শকদের একাংশের আপত্তির মুখে কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ওই ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সেই নীতির পরিপন্থী, যার পক্ষে কলকাতা দীর্ঘকাল ধরে অবস্থান নিয়ে এসেছে।
রবিবার ফের সেই প্রসঙ্গ উঠলে তসলিমা বলেন, "আমার বক্তৃতায় আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছিলাম। সবারই কথা বলার সুযোগ থাকা উচিত। কারও মতামত প্রকাশে বাধা দেওয়া ঠিক নয়।" সেদিন জয় গোস্বামীকে নিয়ে যারা আপত্তি জানিয়েছিলেন তাঁদের আচরণের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "যাঁরা আমার বক্তৃতার প্রশংসা করেছিলেন, তাঁরাই তাঁকে মঞ্চে আসতে দিলেন না। তাঁরা কি আমাকেও প্রশ্ন করেননি? বিষয়টি স্ববিরোধী। যখন কেউ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেন তখন মানুষ তা সমর্থন করেন, কিন্তু যখন কোনও কবিকে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন তাঁরা তাঁকে শুনতে চান না। এটা ঠিক নয়।"
তসলিমার কথায়, তিনি কবি জয় গোস্বামীর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন। তাঁর দাবি, "(ঘটনার পর) জয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাইনি, তবে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব।"
তসলিমা নাসরিন আশা প্রকাশ করেন যে, তাঁর প্রিয় কলকাতা শহরে এমন ঘটনা আর ঘটবে না। তিনি বলেন, "কলকাতা প্রগতিশীলদের শহর। এখানকার মানুষ বাকস্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাসী। মানুষের রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকেরই নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।"
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বর্তমান বিজেপি সরকারের মধ্যে তুলনা করতে বলা হলে, তসলিমা নাসরিন তাঁকে কলকাতায় আসার অনুমতি দেওয়ার জন্য বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রশংসা করেন। বলেন, "অবশ্যই, এই তিনটি সরকারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি সরকার আমাকে বহিষ্কার করেছিল, অন্যটি আমাকে ফিরে আসতে দেয়নি, আর তৃতীয়টি আমাকে আসার অনুমতি দিয়েছে। সেই পার্থক্যগুলোর ওপর মনোযোগ না দিয়ে, আমার মনে হয় আমাদের এই বিষয়টি উদযাপন করা উচিত যে, আমি ফিরে আসতে পেরেছি। ফিরে আসতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, এই সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বাক-স্বাধীনতার অধিকারে বিশ্বাসী,"
নাসরিন জানান, 'সেক্যুলার মিশন' নামের একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে তিনি কলকাতায় এসেছেন এবং রাজ্য সরকার পরবর্তীতে তাঁকে নিরাপত্তা দান ও পশ্চিমবঙ্গ সফরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। শনিবার তিনি বলেছিলেন যে, ১৯ বছর পর তাঁর ফিরে আসা প্রমাণ করে যে "অবিচার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী নয়।" একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তাঁর লড়াই সবসময়ই ছিল নারী অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য, কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়।
কলকাতায় স্থায়ীভাবে ফিরে আসার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নাসরিন বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে এখনও "ভাবেননি", তবে আগামী বছর কলকাতা বইমেলায় আসতে চান। তিনি বলেন, "আমি অবশ্যই কলকাতা বইমেলায় আসতে চাই। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আমাকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই আমি নিশ্চয়ই আসার চেষ্টা করব। আমি আসবই।"
রাজনীতি-নিরপেক্ষ অবস্থানের ওপর ফের জোর দিয়ে তসলিমা বলেন, "আমি অনেক রাজ্যে ভ্রমণ করি। আমি যদি কেরালায় যাই, তবে কি আমি সেই রাজ্যের রাজনীতির অংশ হয়ে যাই? নিশ্চয়ই না। আমি স্বাধীনই থাকি। যে কোনও সরকারই আমাকে নিরাপত্তা দিলে তা কেবল তাদের দায়িত্ব পালন করা মাত্র। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই।"