• ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR প্রত্যাহার হলেও ‘গুরুতর’ অপরাধে অভিযুক্তদের ছাড় নয়: সুপ্রিম কোর্ট
    এই সময় | ০৩ আগস্ট ২০২৬
  • NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের জেরে দায়ের হওয়া FIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান জানাল কেন্দ্র সরকার। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভ চলাকালীন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা FIR সংক্রান্ত পূর্ববর্তী আদেশ স্পষ্ট করে সুপ্রিম কোর্ট সোমবার বলেছে, ‘রাজ্য সরকারগুলি আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা FIR বন্ধ বা প্রত্যাহার করতে স্বাধীন।’ তবে গুরুতর ও জঘন্য অপরাধে অভিযুক্তকে ছাড় নয়।

    কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এ দিন আদালতে জানানো হয় যে, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না করার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, তা থেকে তারা সরে আসেনি এবং সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুনানিতে কেন্দ্র স্পষ্ট করে যে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR প্রত্যাহারের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি তাঁদের মতে, আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেও সমাধানের পথ খোঁজা যেতে পারে।

    সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার শুনানির সময়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, ‘ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি বা আলোচনায় ঘাটতি ছিল। তবে এখন সেই সমস্যা কেটে গিয়েছে।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য ছাত্রদের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাওয়ার কোনও উদ্দেশ্য সরকারের নেই।

    অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার আদালতে প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি সরকার সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তাহলে ইতিমধ্যেই দায়ের হওয়া FIR-গুলি কি প্রত্যাহার (withdraw) করা হবে, নাকি আদালতের মাধ্যমে খারিজ (quash) করা হবে?’ তাঁর দাবি, এই মামলার মূল বিষয় ছাত্রদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, তাই এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

    বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘ফৌজদারি আইনে FIR প্রত্যাহারের আইনি ব্যবস্থা রয়েছে।’ জবাবে তুষার মেহতা জানান, সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। এরই পাল্টা প্রবীণ আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার আদালতকে জানান, তাঁর কাছে পাটনার একটি FIR রয়েছে, যেখানে ১৫২ জনের নাম রয়েছে এবং আরও ৫,০০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যে কাউকে অভিযুক্ত করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে একটি স্পষ্ট নীতি তৈরি করা উচিত।’ এর জবাবে সলিসিটর জেনারেল বলেন, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের কোনও পূর্ব ইতিহাস নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’

    প্রধান বিচারপতি (CJI) মন্তব্য করেন, ‘প্রথমে FIR-গুলিকে শ্রেণিবদ্ধ করা প্রয়োজন। কোন FIR-এ ছাত্ররা অভিযুক্ত এবং কোনগুলিতে পেশাদার বা গুরুতর অপরাধীরা জড়িত, তা আলাদা করে দেখতে হবে। তার পরে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’

    অন্যদিকে, প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ আদালতে দাবি করেন, আগের নির্দেশে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। মিছিলে পুলিশের পদক্ষেপ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিয়ো আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানতে চান, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কেন পেলেট গান-সহ কঠোর বলপ্রয়োগ করা হয়েছিল, সেই বিষয়ে দিল্লি পুলিশের কমিশনার এবং RAF-এর শীর্ষ কর্তার কাছে আদালতের জবাব তলব করা উচিত। একইসঙ্গে পড়ুয়াদের উপরে পুলিশের কথিত অত্যাচারের দায় নির্ধারণ করাও জরুরি। এর প্রেক্ষিতেই প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে একটি স্বাধীন SIT গঠনের বিষয়টিও আদালত বিবেচনা করতে পারে।’

    উল্লেখ্য, গত মাসে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র নেতৃত্বে চলা দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন সরকার কিছু আশ্বাস দেওয়ার পর প্রত্যাহার করা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কোনও ছাত্র বা স্বেচ্ছাসেবকের বিরুদ্ধে যেন পুলিশি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছিল।

    তবে গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশে আগে থেকে দায়ের হওয়া FIR-গুলির তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় CJP উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনের অভিযোগ ছিল, এই নির্দেশকে ব্যবহার করে সরকার ভবিষ্যতে ছাত্রদের হয়রানি করতে পারে। সেই প্রেক্ষিতেই সোমবার আদালতে কেন্দ্রের এই বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

    এর আগে সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী নির্দেশে বলেছিল, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে আপাতত কোনও জবরদস্তি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। পাশাপাশি যেসব নাবালক বা যাদের কোনও অপরাধমূলক অতীত নেই, তাঁদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিল আদালত। পাশাপাশি, আদালত আন্দোলনের সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছিল।

    সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী রাজ্য সরকারগুলি ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া FIR বন্ধ বা প্রত্যাহার করার বিষয়ে স্বাধীন। তবে প্রতিটি মামলার প্রকৃতি বিবেচনা করতে হবে।

    যাঁদের বিরুদ্ধে খুন, গুরুতর হিংসা বা অন্য জঘন্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ছাড় প্রযোজ্য হবে না।

    কেন্দ্র আদালতে জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকার বজায় রেখেছে এবং FIR সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

    প্রধান বিচারপতির মতে, শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র এবং গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাই FIR-গুলিকে আলাদা করে শ্রেণিবদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে।

    আন্দোলনকারীদের আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সময় পেলেট গান-সহ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে দিল্লি পুলিশ ও RAF-এর ভূমিকার ব্যাখ্যা চাওয়া এবং দায় নির্ধারণের দাবি ওঠে।

    প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের বিষয়টি আদালত বিবেচনা করতে পারে।

    শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে যেন কোনও পুলিশি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়—এটাই ছিল আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি।

    আদালত আগেই জানিয়েছিল, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে আপাতত কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। পাশাপাশি নাবালক এবং যাঁদের কোনও অপরাধমূলক অতীত নেই, তাঁদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।

  • Link to this news (এই সময়)