টাকার পাহাড়ে প্রাক্তন ‘বাবু’ টুলু, বুকে পাথরের ধুলো নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় শ্রমিকরা
বর্তমান | ০৩ আগস্ট ২০২৬
শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: কয়েক কদম হাঁটলেই হাঁপ ধরে! রাত বাড়লেই কাশি বেড়ে যায়। বুকের ভিতর যেন পাথর চেপে বসে আছে। একসময় যাঁরা দিনের পর দিন পাথর ভেঙে সংসার চালিয়েছেন আজ তাঁরা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার সিলিকোসিস আক্রান্ত সেই শ্রমিকেরাই টিভির পর্দায়, সংবাদপত্রের পাতায় বীরভূমের পাথর খাদান মালিক টুলু মণ্ডলের আত্মীয়বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা ও সোনার গয়না উদ্ধারের খবর দেখে স্তব্ধ। তাঁদের আক্ষেপ, আমরা ২০০-৩০০ টাকার মজুরিতে বুকভরে পাথরের ধুলো খেয়েছি। আজ কাজ করার শক্তিটুকুও নেই। আর প্রাক্তন মালিকের এত সাম্রাজ্য!
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দেগঙ্গা, মিনাখাঁ, হাড়োয়া, সন্দেশখালিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বছরের পর বছর কাজের খোঁজে মানুষ গিয়েছেন বীরভূমের পাথর খাদানে। বাড়ি ছেড়ে সেখানেই কাজ করতেন তাঁরা। দিনের পর দিন পাথর ভেঙেছেন। ক্রাশার মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন। চারদিকে উড়েছে পাথরের ধুলো। সেই ধুলোই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে শরীরে। তখন কেউ বুঝতেই পারেননি প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে মৃত্যুকেই ডেকে আনছেন। সেই ধুলো থেকেই শরীরে বাসা বেঁধেছে জটিল রোগ ‘সিলিকোসিস’।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন সিলিকাযুক্ত ধুলো ফুসফুসে ঢুকলে এই রোগ হয়। তৈরি হয় ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত। শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। কাশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার শক্তি প্রায় শেষ হয়ে যায়। জেলার বহু পরিবার এই নির্মম বাস্তবের সাক্ষী! ইতিমধ্যেই একাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এখনো শতাধিক মানুষ আক্রান্ত। অনেক বাড়িতে এখন আর রোজগারের মানুষ নেই। যে মানুষ একদিন সংসারের একমাত্র ভরসা ছিলেন আজ তিনিই পরিবারের সবচেয়ে বড়ো চিন্তা। নিয়মিত ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই অনেকের। সরকারিভাবে সাহায্য পেয়ে কিছুটা স্বস্তিতে আছে পরিবারগুলি।
হাড়োয়ার শালিপুরের রেজাউল হক বলেন, আগে দিনে দশ-বারো ঘণ্টা কাজ করতাম। এখন পাঁচ মিনিট হাঁটলেও বসে পড়তে হয়। টিভিতে কোটি কোটি টাকার খবর দেখি। তখন বুকের ভিতরটা আরও ফাঁকা হয়ে যায়। কার কাছে আমরা কাজ করতাম এবার বুঝেছি। দেগঙ্গার রবিউল ইসলামের কথায়, আমরা জানতাম শুধু কাজ করলে ভাত জুটবে। আজ শরীর শেষ। কাজ নেই। চিকিৎসা করার টাকাও নেই। কোটি কোটি টাকার খবর দেখে মনে হয়েছে, আমাদের ঘাম আর শরীরের কোনো মূল্যই ছিল না ওদের কাছে। তুফান মণ্ডল বলেন, শরীরে বাসা বেঁধেছে জটিল রোগ সিলিকোসিস। সরকারিভাবে কিছুটা সাহায্য পাই বলে কোনোরকমে বেঁচে আছি। এসব কী দেখছি টিভিতে! এত বছর পরিশ্রম করেও আজ আমি পরিবারের বোঝা। নিজস্ব চিত্র