নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: জয়েশ যোগ। হানিট্র্যাপ। জঙ্গি নেটওয়ার্ক। এবং গ্রেপ্তার জঙ্গি হামিম মণ্ডল। এই গোটা পর্বে একটি প্রশ্নই তাড়া করে বেড়াচ্ছিল গোয়েন্দাদের—টাকা এবং লজিস্টিকাল সাপোর্ট কোথা থেকে আসত? তদন্তে নেমে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ‘ডেড ড্রপ’ ডেলিভারি। এই পদ্ধতিতেই হামিমের কাছে পৌঁছে যেত সিম এবং টাকা। রিসিভার কে, তা ট্র্যাক করেও পাওয়া যেত না।
গোপনে কথাবার্তা চালানোর জন্য অপ্রচলিত কিন্তু এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করত হামিমরা। শুধু ধৃত জঙ্গি বা অর্পিতা নয়, তাদের ‘রিক্রুটার’দের শীর্ষস্তর পর্যন্ত এই মাধ্যমেই তথ্য আদান-প্রদান চলত। গোয়েন্দারা জেনেছেন, টাকা, মোবাইল ফোন, সিম ও অন্যান্য জিনিসপত্র মূলত আসত পাকিস্তান থেকেই। গোটা বিষয়টাই পরিচালনা করত ভাট্টি গ্যাং। তাদের নেটওয়ার্কেই ঠিক হত, কোথায় হবে ‘ড্রপ পয়েন্ট’। যে ডেলিভারি করত, সে দেখতে পেত না কে ‘কনসাইনমেন্ট’ রিসিভ করল। পুলিশের স্ক্যানারে এলেও মাঝেই হারিয়ে যেত তদন্তের গতিপথ। অর্থাৎ, ফুলপ্রুফ পদ্ধতি। হামিমের কাছে নির্দেশ আসত, ‘অমুক জায়গায় টাকা এসে গিয়েছে। কালেক্ট করে নাও।’ সবটাই নগদ। কারণ, অ্যাকাউন্ট বা ওয়ালেট মারফত এলে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই একাধিক হাওলা কারবারির হাত ঘুরে ‘ড্রপ পয়েন্টে’ পৌঁছাত টাকা। জানা যাচ্ছে, হাওড়া পিলখানা, রাজারহাট, বনগাঁ, সাহেবগঞ্জ এবং মুর্শিদাবাদের একাধিক জায়গায় এমন ‘ড্রপ পয়েন্ট’ রয়েছে। একাধিক ঠিকানায়, একাধিক ব্যক্তির কাছে। বহু পরিত্যক্ত বাড়িতেও। টাকা বাইরে থেকে এলেও সিম আসত ভিন রাজ্য থেকে। এর আয়োজনও ভাট্টি নেটওয়ার্কই করত। হুন্ডির কোনো কারবারি বা মোবাইল সিমের দোকানদার বেশিরভাগ সময় ডেলিভারি করত। মেসেজে নির্দেশ আসার পর তা সংগ্রহ করতে যেত হামিম বা তার কোনো লোক। গোটা অপারেশনটাই চলত স্লিপার সেলের কায়দায়। তদন্তে উঠে এসেছে, যেখান থেকে কনসাইনমেন্ট আসত, বা যেখানে ডেলিভারি হত—প্রত্যেকেই আসলে কোনো না কোনোভাবে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে যুক্ত। আর একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে গোয়েন্দাদের কাছে—হামিম একা নয়। জাল অনেকটাই ছড়িয়েছে। তাই সব ‘ড্রপ পয়েন্টে’র খবর হামিমের কাছেও নেই। বেশকিছু তার রেডারের বাইরে রয়েছে। সেটাই ভাবাচ্ছে গোয়েন্দাদের। হামিমের সঙ্গে ভাট্টি গ্যাংয়ের শীর্ষস্তরের প্রায় হাজার খানেক কথোপকথন বিশ্লেষণ করেছেন গোয়েন্দারা। রাজ্যে রাজ্যে স্লিপার সেলের জাল আরও ছড়ানোর প্ল্যানে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল এই চক্র। হামিম টাকা পাঠাত অর্পিতার কাছে। এই ‘লাস্যময়ী’ও নেটওয়ার্ক বিস্তারের কাজে পুরোদমে নেমেছিল। সূত্রের খবর, হামিম ও অর্পিতাকে দুবাই পাঠানোরও প্ল্যান ছিল ভাট্টি নেটওয়ার্কের। সেখানে ‘রিক্রুট’ সংক্রান্ত বৈঠক হওয়ার কথা ছিল আইএসআই কর্তাদের সঙ্গে। কিন্তু ভিসা সংক্রান্ত কিছু সমস্যায় গোটা প্রক্রিয়া থমকে যায়। তারপরই ধরা পড়ে হামিম। পরের ধাপে অর্পিতা।