প্রকাশক পাচ্ছিলেন না, সেই বইয়ের জন্যেই কমিকসের ‘অস্কার’-এ মনোনীত বনগাঁর ছেলে চার্বাক
এই সময় | ০৩ আগস্ট ২০২৬
কমিকস বললেই এখনও অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, স্পাইডার-ম্যান কিংবা টিনটিনের ছবি। কিন্তু কমিকসের জগৎ আজ আর শুধু সুপারহিরো বা রোমাঞ্চকর অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন এক শক্তিশালী গল্প বলার মাধ্যম, যেখানে সাহিত্য, শিল্প, সমাজ, রাজনীতি, স্মৃতি, ইতিহাস—সবকিছুরই সমান জায়গা রয়েছে। আর সেই বিশ্বমানের কমিকসের মানচিত্রে এ বার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বাংলার শিল্পী চার্বাক দীপ্তর নাম।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কমিকস জগতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আইসনার অ্যাওয়ার্ডস (Eisner Awards)-এ মনোনয়ন পেয়েছে চার্বাকের ডিজিটাল গ্রাফিক নভেল 'লুবলুর পৃথিবী'। কমিকস জগতের সর্বোচ্চ সম্মানগুলির মধ্যে অন্যতম এই পুরস্কারকে অনেকেই 'কমিকসের অস্কার' বলে থাকেন। এখানেই শেষ নয়, একই কাজের জন্য হার্ভে অ্যাওয়ার্ডস (Harvey Awards)-এর ডিজিটাল বুক অফ দ্য ইয়ার বিভাগেও মনোনয়ন পেয়েছেন। একসঙ্গে দুটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার এক শিল্পীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বড় প্রাপ্তি।
চার্বাক উত্তর ২৪ পরগণা, বনগাঁর ভূমিপুত্র। যাদবপুরের প্রাক্তনী। বহুদিন ধরেই ইলাস্ট্রেশন, গ্রাফিক স্টোরিটেলিং এবং কমিকস নিয়ে কাজ করছেন। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি যে ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করেছেন, তা আজ আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছেও সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য। তবে স্বীকৃতির কথা ভেবে কখনওই কোনও কাজ করেননি চার্বাক। তাই তিনি অকপটে বলেন, 'পাঠকের ভালোলাগবে কি না. সেসব কিছু কখনওই ভাবিনি। আমার ভাবনা শুধু ফুটিয়ে তুলেছি। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে এই স্বীকৃতি পাব, সেটা ভাবিনি।'
'লুবলুর পৃথিবী' চার্বাককে পাঠকমহলে আলাদা পরিচিতি দিলেও তাঁর কাজের পরিসর অনেক বিস্তৃত। সুকুমার রায়ের কালজয়ী 'হ-য-ব-র-ল'-কে তিনি নতুনভাবে গ্রাফিক রূপ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বীরপুরুষ' থেকে জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন'— বাংলা সাহিত্যের একাধিকসৃষ্টিকে তিনি কমিক্স ও ভিজ্যুয়াল ভাষায় পুনরায় বিনির্মাণ করেছেন। এমনকী সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' ছবির সেই বহুচর্চিত টাকার পাহাড়ের স্বপ্নদৃশ্যও তাঁর হাতে পেয়েছে কমিক্সের রূপ। সম্প্রতি উইল আইসনারের বিখ্যাত গ্রাফিক নভেল A Contract with God-এর বাংলা অনুবাদও করেছেন চার্বাক।
কমিক্স আর ইলাস্ট্রেশনের জগতে চার্বাকের পথচলা শুরু হয়েছিল সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে কার্টুন আঁকার মাধ্যমে। পরে আন্তর্জাতিক এক প্রকাশনা সংস্থাতেও ইলাস্ট্রেটর হিসেবেও কাজ করেন। 'লুবলুর পৃথিবী'র যাত্রাও ছিল বেশ চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। প্রথমে বইটি ইংরেজিতে লিখেছিলেন চার্বাক। কিন্তু একাধিক প্রকাশনা সংস্থা সেই পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করেনি। তখন তিনি ভাষা বদলে বাংলায় বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত মোড় ঘুরিয়ে দেয়। 'বুক ফার্ম'-এর হাত ধরে প্রকাশিত হওয়ার পর বইটি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় পাঠকদের দৃষ্টি কাড়ে। পরে 'নারায়ণ দেবনাথ পুরস্কার' পাওয়ার পর বইটির পরিচিতি আরও বাড়ে।
কমিকসের পাঠক থাকলেও, কমিকস নিয়ে কাজ করার প্রতি নতুন প্রজন্মের বিশেষ আগ্রহ চোখে পড়ে না। চার্বাকের এই স্বীকৃতি কি খানিকটা হলেও সেই উৎসাহ উস্কে দেবে? চার্বাকের কথায়, 'কমিকস নিয়ে কাজ করার ভাবনা কম। বেশিরভাগই অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করতে চায়। আমি চাই কমিকস শিল্পীদের সংখ্যা আরও বাড়ুক।'