এতদিন ডাগ আউট বসে খেলা দেখতেন। এ বার ময়দানে নেমেছিলেন। প্রথম ম্যাচেই বড় জয়। ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার উদয় হলো? নাকি এই উত্থান সাময়িক? উত্তর দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। তবে রাজনৈতিক জীবনে দৌড়ের প্রথম ল্যাপেই প্রশান্ত কিশোর বুঝিয়ে দিলেন, ‘হাম কিসিসে কম নহি’।
কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ডেটা ঘাঁটাঘাঁটি করে। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের অর্থায়নে পরিচালিত জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচিতে কাটিয়েছেন আটটি বছর। ইউনিসেফের (UNICEF) ‘সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড প্ল্যানিং’ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে কাজের সঙ্গে রাজনীতির যোগ ছিল না। রাজনৈতিক জীবনে হাতেখড়ি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে ২০১১ সালে। কাজ ছিল ‘স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি। ২০১২ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচন থেকে নিজের মগজাস্ত্রকে কাজে লাগাতে শুরু করেন কিশোর। স্লোগান তৈরি, ক্যাম্পেন প্ল্যানিং, জেতা-হারার পরিসংখ্যানের হিসাব-নিকাশ— দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে পর্দার আড়ালে। প্রচারের স্পটলাইট তখনও কিশোরের মাথায় পড়েনি।
দলীয় রাজনীতির ‘ঘরে-বাইরে’ শুরুটা অবশ্য গুরু নীতীশ কুমারের হাত ধরে। ২০১৮ সালে জনতা দল ইউনাইটেড (JDU)-এ যোগ দেন। তাঁকে দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি বানানো হয়েছিল। মন টেকেনি বেশিদিন। ফিরে যান ‘কিং মেকার’-এর ভূমিকায়। দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে একাধিক রাজনৈতিক দলের ‘ডুবন্ত’ নৌকার তিনিই ছিলেন ‘সিন্দাবাদ দ্য সেলার’। সাফল্যের ট্র্যাক রেকর্ড একশোয় একশো। ২০২১ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি— একাধিক দল ছিল তাঁর হাতে তৈরি কোম্পানির ক্লায়েন্ট। বুঝিয়ে দেন আধুনিক রাজনীতির তিনিই চাণক্য।
এর পরে প্রায় এক বছরের কার্যত ‘অজ্ঞাতবাস’। মানুষ যখন প্রায় ভুলতেই বসেছিল, তখন হঠাৎ প্রকাশ্যে এসে প্রশান্ত জানালেন, এ বার তিনি ধুলো-কাদা মেখে রাজনীতি শিখবেন। ডেটা-ইন্টারনেটে নয়, জনসংযোগ হবে মাঠে-প্রান্তরে। প্রায় দু’বছর ধরে বিহারের আনাচে-কানাচে চলে ‘জন সুরাজ অভিযান’। গান্ধীবাদী প্রশান্ত বোঝালেন, ‘পথে এ বার নামো সাথী, পথেই হবে পথ চেনা।’
ঠেকে এবং ঠকে– উভয় শিক্ষাই হয়তো কিছুটা পরিণত করে প্রশান্তকে। এক বড় জাতীয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা, নিয়ন্ত্রণ হাতে পাওয়ার কথাবার্তা হলেও ফিরে আসতে হয়েছে তাঁকে। ২০২৪ সালে নিজেই দল বানিয়ে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী দেন। ২৪৩-এর মধ্যে ২৩৮টি আসনে লড়ে ফলাফল হয় শূন্য। এ বার জীবনের অন্যতম কঠিন লড়াইয়ে নামলেন নিজেই। বাঁকিপুর উপনির্বাচনে সংসদীয় নির্বাচনের প্রথম লড়াই।
২০০৮ সালে তৈরি হয় বাঁকিপুর বিধানসভা। সেই থেকে আসনটি ছিল বিজেপির দখলে। অর্থাৎ ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বাঁকিপুরের রঙ গেরুয়া। তার থেকেও বড় বিষয় হলো— এটি বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবিনের বিধানসভা কেন্দ্র। রাজ্যসভায় যোগ দেওয়ার জন্য চলতি বছরের শুরুর দিকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার আগে তিনি এখান থেকে চারবার জয়ী হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি প্রথমবার এই এলাকা থেকে জয়ী হন। নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে এটি ‘পাটনা পশ্চিম’ (Patna West) নামে পরিচিত ছিল। এর আগে তাঁর বাবাও চারবার এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
বর্তমান সীমানা অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে বিজেপির সর্বনিম্ন ভোট প্রাপ্তির হার ছিল ৫৯ শতাংশ (২০২০ সালে)। সর্বনিম্ন ব্যবধানটিও ছিল ২৯ শতাংশ। 'উচ্চবর্ণের' মানুষের ব্যাপক প্রভাব থাকায়, গুজরাটের শহরাঞ্চলের কিছু আসনের মতোই এই আসনটিকে বিজেপির জন্য অত্যন্ত ‘নিরাপদ’ বলে মনে করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন,
১) এই উপনির্বাচনকে প্রশান্ত কিশোর নিজের এবং বিহারের নয়া মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সরাসরি দ্বৈরথ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। গোটা প্রচার পর্ব জুড়ে সম্রাট চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা ফৌজদারি মামলা ও তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। ‘পলিটিক্যাল ফিগার’ হিসেবে এই লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন প্রশান্ত।
২) শুরু থেকেই এই আসন ছিল সিনহাদের (নীতিন নবীনের পরিবার) পারিবারিক আসন। স্বাভাবিক ভাবেই, একটি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা জন্ম নেয় মানুষের মধ্যে। স্থানীয় অনুন্নয়নকে হাতিয়ার করে প্রশান্ত কিশোর প্রচার চালিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জিতে আসল আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাবে।
৩) গ্রাউন্ড রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, বিজেপি কায়স্থ ভোট ধরে রাখতে পারলেও অন্যান্য উচ্চবর্ণের মধ্যে তাদের প্রভাব কমেছে। এছাড়া কৌশলগত কারণে আরজেডি-র যাদব ও মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশও কিশোরের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলেও খবর। পাশাপাশি দলিত এবং এমবিসি (MBC) ও ইবিসি (EBC) ভোটারদের কাছ থেকেও তিনি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন। সেটাই জয়ের ব্যবধান তৈরি করে দেয়।
৪) বিহারে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রশান্ত কিশোর ‘জন সুরাজ’-কে ‘বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, বাঁকিপুর আসনটি ধরে রাখার বিষয়ে বিজেপির কিছু নেতার আত্মবিশ্বাস ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।
৫) সম্প্রতি দিল্লিতে হওয়া পড়ুয়াদের আন্দোলনের বিশাল প্রভাব দেখা গিয়েছিল বিহারেও। রাজধানী পাটনার নিকটস্থ এই আসনে সেই আন্দোলনের আঁচ এই নির্বাচনেও পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
মাত্র এক বছর আগেই বিহার দখল করেছে বিজেপি জোট। উপনির্বাচনে পাশা পাল্টানোর উদাহরণ খুব কম। সেখানে বিজেপির জাতীয় সভাপতির আসনে এই পরাজয় কি বড় ক্ষত? বিহার বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে অবশ্য লেখা হয়েছে, ‘জনমতই সর্বপ্রধান। বাঁকিপুরকে অভিবাদন! বাঁকিপুরের জনগণের সিদ্ধান্ত আমরা বিনম্র ও সানন্দ চিত্তে গ্রহণ করছি। যে সমর্থন ও আশীর্বাদ আমরা পেয়েছি, তার জন্য বাঁকিপুরের জনগণকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ; আর সকল নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর নিষ্ঠার প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।’
তবে এই জয় ময়দানে টিকে থাকার অক্সিজেন দিল প্রশান্তকে। ভোট রাজনীতিতে সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হবেন একদা ভোটকুশলী? ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ…