• প্রেমিকার মন পেতে কি মাদক চক্রে যুবক? ওষুধ ব্যবসায়ীর ঘরে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা
    এই সময় | ০৪ আগস্ট ২০২৬
  • কৌশিক দে, মালদা

    প্রেমিকার মন জোগাতেই নাকি অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন বাড়ির একমাত্র ছেলে। এমনই অভিযোগ তুলল মালদায় ধৃত যুবকের পরিবার। তাঁর ভাড়া বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা নগদ উদ্ধার করবে পুলিশ, তা কল্পনাও করতে পারেননি পরিজনেরা।

    বেআইনি কাফ সিরাপ পাচারচক্রের তদন্তে রবিবার গভীর রাতে পুরাতন মালদায় অভিযান চালায় দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পুলিশ। মঙ্গলবাড়ি চৌরঙ্গি মোড় এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে তারা হানা দেয় মালদা জেলা পুলিশের সহযোগিতায়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় পিন্টু সরকারকে, যিনি ওষুধ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ কাফ সিরাপ। ভাড়া বাড়ির আলমারিতে থরে থরে সাজানো ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিল পাওয়া যায়। টাকা গোনার জন্য আনা হয় মেশিন। পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া নগদের অঙ্ক প্রায় ২ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা। পিন্টু ছাড়াও আরও দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাতেই তিন জনকে বালুরঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়।

    পুরাতন মালদা পুরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের নবাবগঞ্জ এলাকায় ২৬ বছরের পিন্টুর পৈতৃক বাড়ি। সোমবার সকালে সেখানে ভিড় জমে যায়। উঠে আসে এক রহস্যময়ীর কথা। পরিবার থেকে প্রতিবেশী, অনেকের বক্তব্যে এক মহিলার কথা ঘুরেফিরে এসেছে। ধৃতের বাবা নরোত্তম সরকার বলেন, 'কোনও এক তরুণীর পাল্লায় পড়ে জগৎটাকেই অন্ধকার করে ফেলেছিল ছেলে। আমাদের সঙ্গে সম্পর্কও বিচ্ছেদ করেছিল। আলাদা হয়ে একটি বড় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত। ছেলের এই কুকীর্তির বিষয়ে আর কিছু বলতে পারব না।'

    নবাবগঞ্জে থাকে ধৃতের পরিবার। রাস্তার ধারে গুমটি দোকানে মুখরোচক খাবার বিক্রি করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, পুরাতন মালদাতেই থাকেন ওই তরুণী। এক-দেড় বছর আগে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে পিন্টুর। এর পরে যুবকের আচরণে বড় পরিবর্তন আসে। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। রাতারাতি অর্থ উপার্জন করতে শুরু করেন তিনি। অভিযোগ, ওই তরুণীকে সোনা থেকে হিরের গয়না উপহার দিতেন পিন্টু।

    অভিযুক্তের কয়েকজন প্রতিবেশীরও দাবি এক। তাঁদের কথায়, 'পিন্টু এখনকার মতো ছিল না। এক-দেড় বছর ধরে যেন ওকে দেখে চেনা যাচ্ছিল না। কোনও এক তরুণীর সঙ্গে দেখা যেত। ওই মহিলার পাল্লায় পড়ে পিন্টু অপরাধ জগতে মিশে যায়। রাতারাতি গাড়ি, দোকান, সোনার অলঙ্কার নইলে আসবে কোথা থেকে! তা বলে ওর ঘর থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হবে, সেটা আমাদের কল্পনাতে ছিল না।'

    যে বাড়িতে পিন্টু ভাড়া থাকতেন, তার মালিক দিলীপ সাহা। তিনি পুরাতন মালদা পুরসভার তৃণমূল ঘনিষ্ঠ এক প্রাক্তন চেয়ারম্যানের অনুগামী বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তদন্তকারীদের দিলীপ বলেন, 'আমি শুধু ঘর ভাড়া দিয়েছিলাম। যুবকের বাড়ি পুরাতন মালদায় বলে জানিয়েছিলেন। সামান্য ভাড়া দিতেন।' পুরাতন মালদার স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পরে পড়াশোনা ছেড়ে দেন পিন্টু। প্রায় ছ'-সাত বছর বিভিন্ন ওষুধের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। এক-দেড় বছর আগে পুরাতন মালদায় একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন। পুলিশের দাবি, এই ব্যবসার আড়ালেই বেআইনি কাফ সিরাপ পাচারের চক্র গড়ে তোলেন তিনি।

    পাচারচক্র ঘিরে তদন্তের সূত্রপাত গত ৫ জুলাই। সে দিন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সীমান্তবর্তী মেহেন্দিপাড়া এলাকা থেকে প্রায় দেড় হাজার বোতল কাফ সিরাপ-সহ চার জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চক্রের মূল পান্ডা হিসেবে পিন্টুর নাম উঠে আসে। সেই সূত্র ধরেই রবিবারের অভিযান। তদন্তকারীদের অনুমান, দক্ষিণ দিনাজপুরের সীমান্তপথ ব্যবহার করে নিয়মিত বাংলাদেশে ফেন্সিডিল পাচারের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন পিন্টু। পুলিশকে ভাবাচ্ছে রহস্যময়ীর ভূমিকা। আদৌ কি পিন্টুর সঙ্গে ওই তরুণীর সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পরে তাঁর বাড়বাড়ন্ত? তরুণীর কি কোনও ভূমিকা আছে পাচারচক্রে? এ সব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছে পুলিশ।

  • Link to this news (এই সময়)