• চিকেনেই এখন বাড়ছে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি! কী বলছে আন্তর্জাতিক গবেষণা?
    এই সময় | ০৪ আগস্ট ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    কম খরচে প্রোটিনের জোগান দিতে গোটা বিশ্বেই বাণিজ্যিক মডেলে পোলট্রি চাষের বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু এ বার তারই 'পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া' জনস্বাস্থ্যের বড় মাথাব্যথা হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক একটি গবেষণায় দাবি, বিশালাকার মুরগির খামার এখন এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে সারা দুনিয়ায়, যেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর জেজুনি নামের ব্যাকটেরিয়া। এই জীবাণুই বিশ্বে খাদ্যবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত ডায়ারিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। শুধু তাই নয়, খামারে হরেক জীবাণুর অবাধ আদানপ্রদান এবং দেদার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে আরও শক্তিশালী ও ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। ব্যতিক্রম নয় ভারত কিংবা পশ্চিমবঙ্গও।

    'প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস' (পিএনএএস)-এর মতো বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে হওয়া এই গবেষণায় ১৯৭৯ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে মুরগি ও বন্য পাখি থেকে সংগৃহীত প্রায় ২ হাজার ৮০০টি ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ব্রিটেন, আমেরিকা, চিন, ভারত-সহ ৩০টি দেশের নমুনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, বাণিজ্যিক পোলট্রি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মুরগি ও বন্য পাখির মধ্যে এই ব্যাকটেরিয়ার আদানপ্রদান এই ৪৫ বছরে প্রায় ১০০ গুণ বেড়েছে।

    গবেষকদের বক্তব্য, ১৯৬০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বে মুরগির সংখ্যা সাত গুণ বেড়ে প্রায় ২,৭০০ কোটিতে পৌঁছেছে। পৃথিবীর মোট পাখির যা জৈবভর(বায়োমাস) তার প্রায় ৭০ শতাংশই এখন পালিত মুরগি। এত বিপুল সংখ্যক পাখিকে অল্প জায়গায় পালন করার ফলে জীবাণুর সংক্রমণ, জিনগত পরিবর্তন এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্র বহুগুণে বেড়েছে। রান্না করে জীবাণু নষ্ট হলেও কাঁচা মুরগির মাংস কাটার সময়ে সামান্য অসাবধানতায় রান্নাঘরের অন্যান্য খাবার বা বাসনে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। বিপদ রয়েছে ঝলসানো কিংবা সেঁকা মুরগির নানা পদেও।

    ভারতও এই উদ্বেগ থেকে মুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অন্যতম বড় পোলট্রি উৎপাদক ভারত এবং দ্রুত সম্প্রসারিত পোলট্রি বাজারের অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও এই গবেষণার তাৎপর্য কম নয়। রাজ্যে মুরগির মাংসের চাহিদা ও উৎপাদন— দু'টিই ক্রমে বাড়ছে। ফলে খামারে বায়োসিকিউরিটি, অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, স্লটার-হাউস ও কোল্ড-চেন ব্যবস্থায় কড়া নজরদারি এবং রান্নাঘরে নিরাপদ খাদ্য ব্যবহারের অভ্যাস— সব কিছুকেই আরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই লড়াই শুধু খাদ্য নিরাপত্তার নয়, ভবিষ্যতের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ ঠেকানোরও।

    রাজ্য প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সিদ্ধার্থ জোয়ারদার বলেন, 'খাদ্য সুরক্ষা ও প্রোটিন সরবরাহের জন্য সংগঠিত ক্ষেত্রে, বিশেষত মুরগি পালনের বড় খামারে 'ইনটেনসিভ ফার্মিং' জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা উন্নত প্রযুক্তির বাস্তবসম্মত প্রয়োগও বটে। কিন্তু এই গবেষণাপত্র যা তুলে ধরেছে, তা তো সভ্যতার সঙ্কট! একদিকে খাদ্যসুরক্ষার প্রশ্নে মুরগি পালনকে বাতিল করা যাবে না, অন্যদিকে এই ধরনের আশু বিপদ এড়াতে জৈবসুরক্ষার উপরে জোর দিতে হবে।'

    এই মর্মে সচেতনতা বাড়ানো এবং সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ করাকে এই পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মনে করিয়ে দিচ্ছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রাবায়োলজি বিভাগের শিক্ষক-চিকিৎসক সৌগত ঘোষও। তিনি বলেন, 'পশু-প্রাণী-পাখির স্বাস্থ্য এবং মানুষের স্বাস্থ্য এখন আর আলাদা করে দেখা হয় না। এখন সবই 'ওয়ান হেলথ' হিসেবে দেখা হয়। তাই মুরগি প্রতিপালনে জৈবসুরক্ষায় জোর না দিলে তার সবচেয়ে বেশি কুপ্রভাব সইতে হবে মানুষকেই। সংক্রমণের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক রেজ়িস্ট্যান্সের আশঙ্কা নইলে পদে পদে।'

  • Link to this news (এই সময়)