সংসদের অধিবেশন শুরু হতে না হতেই বার বার মুলতবি। বিরোধীদের প্রস্তাব সরকারপক্ষ না মানায়, পাল্টা বিরোধীদের হট্টগোলে ব্যাহত সংসদের কাজ। গ্রীষ্মকালীন অধিবেশন হোক বা বাদল অধিবেশন, সরকার-বিরোধী দ্বন্দ্বে বার বার অচল পার্লামেন্ট। অন্য দিকে, এই অচলাবস্থার কারণে কোনও কার্যকরী আলোচনা বা কাজ না হওয়ায় জলে যাচ্ছে করদাতাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ।
বিরোধীদের বিক্ষোভের আবহে সামনে এল চাঞ্চল্যকর একটি পরিসংখ্যান। একটি সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি দিনের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভার কাজ পরিচালনা করতে ভারত সরকারের কোষাগার থেকে খরচ হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংসদ অধিবেশনের প্রতিটি দিনই সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা কার্যকর ভাবে চলুক বা বার বার মুলতবি হোক।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকের এক ঘণ্টা বাদ দিলে অন্তত ছয় ঘণ্টা সচল রাখতে হয় সংসদ। এই হিসাব অনুযায়ী, সংসদ পরিচালনার জন্য প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২.৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। এই খরচের মধ্যে সাংসদদের বেতন ও ভাতা, সংসদ সচিবালয়ের কর্মীদের বেতন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুবাদ পরিষেবা, লাইভ সম্প্রচার, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সংসদ সচিবালয়ের জন্য প্রায় ১,৬৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই বার্ষিক ব্যয়কে সংসদের মোট কার্যদিবসের সঙ্গে ভাগ করে দৈনিক পরিচালন ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব কষা হয়, যা প্রতিদিনের হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের বাদল অধিবেশন ২০ জুলাই থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে। মোট ২৫ দিনের মধ্যে ১৯টি বৈঠক হওয়ার কথা। এই অধিবেশনে প্রশ্নফাঁস বিরোধী বিল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংক্রান্ত সংশোধনী বিল-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে আলোচনা ও পাশের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সংসদে ২৮টি বিলের আলোচনা ঝুলে রয়েছে।
চলতি বাদল অধিবেশনের একাধিক দিনে সরকার ও বিরোধীদের তুমুল সংঘাত, স্লোগান, ওয়াকআউট এবং বার বার মুলতবির কারণে কার্যকর সময় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। সংসদ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি নষ্ট হওয়া কাজের মিনিটের সঙ্গে জনসাধারণের করের অর্থও কার্যত অপচয় হয়। তাই শুধু রাজনৈতিক সংঘাত নয়, সংসদের উৎপাদনশীলতা (Productivity) নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংসদে অচলাবস্থা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন অধিবেশনে দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ ও মুলতবির ফলে কোটি কোটি টাকার জনসম্পদ ব্যয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংসদীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরোধিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিল, জনস্বার্থের বিষয় এবং নীতি নিয়ে আলোচনা বাধাগ্রস্ত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর।
এ বছরের ৪ অগস্ট পর্যন্ত সংসদে অধিবেশনের ১২ দিন কেটে গিয়েছে। নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রাম মন্দিরের অনুদান চুরির ঘটনায় প্রতিবাদ ও স্লোগানের কারণে বেশ কয়েকবার অধিবেশনে বিঘ্ন ঘটে। অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহেই লোকসভা ও রাজ্যসভা বার বার ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, সংসদের নিম্নকক্ষ মাত্র ১.৬ ঘণ্টা কাজ করতে পেরেছিল, যা এর নির্ধারিত সময়ের মাত্র ৫ শতাংশ। অন্য দিকে, রাজ্যসভা মাত্র ১.৭ ঘণ্টা সচল ছিল, যা মোট বরাদ্দ সময়ের মাত্র ৬ শতাংশ।
২৭ জুলাই, সংসদের উভয় কক্ষই পুরো দিনের জন্য মুলতবি হয়ে গিয়েছিল। ৩১ জুলাই, যদিও লোকসভায় জন্ম ও মৃত্যু রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) বিলটি বিনা বিতর্কে পাশ হয়েছিল। এ ছাড়া অ্যান্টি-পেপার লিক বিল এবং বন্দে মাতরম-এর সম্মানার্থে আনা বিলও পাশ হয়েছে এই সেশনে। তবে প্রথমে নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং সম্প্রতি রাম মন্দির চুরির কেলেঙ্কারি নিয়ে ক্রমাগত হট্টগোলের কারণে এই সেশনে প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং জ়িরো-আওয়ার একবারও অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, লোকসভা ও রাজ্যসভার এক দিনের অধিবেশন পরিচালনা করতে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
প্রতিদিন কার্যকরী সময়ের হিসাব অনুযায়ী সংসদ পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২.৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়।
সাংসদদের বেতন-ভাতা, সংসদ সচিবালয়ের কর্মীদের বেতন, নিরাপত্তা, অনুবাদ পরিষেবা, লাইভ সম্প্রচার, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
সংসদ সচিবালয়ের বার্ষিক বাজেটকে সংসদের মোট কার্যদিবসের সঙ্গে ভাগ করে আনুমানিক দৈনিক পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়।
২০ জুলাই থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বাদল অধিবেশন নির্ধারিত হয়েছে। মোট ২৫ দিনের মধ্যে ১৯টি বৈঠক হওয়ার কথা।
গুরুত্বপূর্ণ বিল, প্রশ্নোত্তর পর্ব, জিরো আওয়ার এবং অন্যান্য আইন প্রণয়নের কাজ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে সংসদের উৎপাদনশীলতা কমে এবং সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকর কাজ কম হয়।
NEET প্রশ্নপত্র ফাঁস, রাম মন্দিরের অনুদান সংক্রান্ত বিতর্ক এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকার ও বিরোধীদের সংঘাতের জেরে একাধিক দিন সংসদের কাজ ব্যাহত হয়েছে।
না। অধিবেশন মুলতবি হলেও সংসদ পরিচালনার অধিকাংশ স্থায়ী ব্যয়—যেমন কর্মীদের বেতন, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অবকাঠামো—চলতেই থাকে। তাই কার্যকরী কাজ না হলেও সরকারি অর্থ ব্যয় অব্যাহত থাকে।