• মোগলাই পরোটায় আকর্ষণ হারাচ্ছে কলকাতা?
    আজকাল | ০৫ আগস্ট ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুচমুচে, ডিম কিংবা মাংসের পুরে ঠাসা কয়েকস্তর মোটা মোগলাই পরোটা, একসময় কলকাতার কেবিন-রেস্তোরাঁ ও রাস্তার ধারের ছোটখাটো খাবারের দোকানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। হুট করে অতিথি চলে এসেছেন? স্থানীয় কোনও দোকান থেকে মোগলাই পরোটা কিনে আনলেই সমস্যার সমাধান। কিন্তু বর্তমানে নতুন নতুন সব খাবারের ভিড়ে বাঙালির এককালের অতিপ্রিয় মোগলাই পরোটা যেন কিছুটা আড়ালে ঢাকা পড়েছে।তবে শহরের ভোজনরসিকরা কি এখনও এর সেই পুরনো স্মৃতি বা নস্টালজিয়া আঁকড়ে ধরে আছেন?

    কীভাবে তৈরি হয় মুঘলাই পরোটা?ময়দা দিয়ে পাতলা রুটি বা শিট বেলে তার মাঝখানে ফেটানো ডিম দেওয়া হয়। এরপর রুটির চারপাশ ভাঁজ করে একটি ‘পার্সেল’-এর মতো আকার দেওয়া হয়। সবশেষে মাঝারি থেকে কম আঁচে গরম তেলে তাওয়ায় এটি ভাজা হয়। ডিমের পুরের বদলে খাসির মাংসের কিমাও ব্যবহার করা যেতে পারে। ধীর আঁচে ভাজার ফলে বাইরের অংশটি মুচমুচে হয়, আর ভেতরটা নরম থাকে। এরপর পরোটাটি পরিবেশন করা হয় সেই বিখ্যাত আলুর তরকারি, শসা-পেঁয়াজের সালাদ এবং কেচাপের সঙ্গে।

    কেবিনের টেবিল থেকে খাবারের স্মৃতিকলকাতায় মোগলাই পরোটা খাওয়ার সেরা জায়গা শহরের ‘কেবিন’ রেস্তোরাঁগুলো। কেবিন-সংস্কৃতি কমে আসায় অনেকেই হয়তো ভুলে গিয়েছেন, শেষ কবে তাঁরা মোগলাই পরোটা খেয়েছিলেন।

    তবে খাদ্য-ইতিহাসবিদ ও নথিপত্র-সংগ্রাহক অমর মুখার্জির কাছে কলকাতার পুরনো কেবিন-সংস্কৃতির সঙ্গে মোগলাই পরোটা আজও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, “মোগলাই পরোটা কি তার আকর্ষণ হারাচ্ছে? হয়তো কিছুটা, তবে আমার মনে হয় না কলকাতার মানুষের হৃদয়ে এর জায়গাটা কমেছে।” অমর মুখার্জির স্মৃতিতে এখনও টাটকা, রেস্তোরাঁর কাঠের টেবিল, ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা এবং মুচমুচে ডিম-ভরা মোগলাই পরোটার সঙ্গে সেই বিশেষ আলুর তরকারি।

    অমর বাবুর মতে, ওই আলুর তরকারিএই খাবারের একটি অপরিহার্য অংশ। হালকা মশলার হলুদ রঙের আলুর তরকারি পরোটার স্বাদকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। আর এই বিশেষ সংমিশ্রণই খাবারটিকে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে।

    অমর মুখার্জির কাছে মোগলাই পরোটা খাওয়ার জন্য ‘অনাদি কেবিন’ই হল সেরা গন্তব্য। ৯০ থেকে ১০০ টাকা মূল্যের 'আনাদি'-র সুস্বাদু ও মুচমুচে মোগলাই পরোটা দীর্ঘদিন ধরেই ভোজনরসিকদের মন জয় করে আসছে। এই ক্যাবিনের এক কর্মী বলেন, "সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর চাহিদা কিছুটা কমেছে। আগে অনেক নিয়মিত খদ্দের আসতেন, কিন্তু এখন মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে ওঠায় ক্রেতার সংখ্যা কমে গিয়েছে।"

    কলকাতার ইতিহাস-অনুসন্ধানী ও পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিসের আধিকারিক সৌম্যা শীল প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় এই খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার দিনগুলোতে কলেজ স্ট্রিট কেবল পড়াশোনার কেন্দ্রই ছিল না, বরং তা ছিল ভোজনরসিকদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।" বসন্ত কেবিন বা দিলখুশা কেবিনের আকর্ষণই ছিল সেখানকার মোগলাই পরোটা।

    মোগলাই পরোটার উৎপত্তি কোথায়?এর উৎপত্তির ইতিহাস বেশ বিভ্রান্তিকর। অনেকের মতে, মোগলাই পরোটার সহ্গে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম জড়িত। এমন গল্পই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। তবে সৌম্যা শীল বলেন, "সম্রাট নিজে এই খাবারটি তৈরি করেছিলেন বা এর প্রচলন করেছিলেন, এমন কোনো সমসাময়িক ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।" বাংলায় মোঘল রন্ধনশৈলীর ব্যাপক প্রভাবের সূত্রপাতকে সৌম্যা শীল ১৫৭৬ সালে আকবরের বাংলা জয়ের পরবর্তী সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন।

    মোঘল প্রশাসক, সৈন্য, রাঁধুনি ও অন্যান্যরা যখন এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে শুরু করেন, তখন রাজকীয় রন্ধনরীতির সঙ্গে স্থানীয় উপাদান ও স্বাদের সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে। এই প্রভাব পরবর্তীতে কলকাতায় এসে পৌঁছায় এবং এখানকার 'ক্যাবিন রেস্তোরাঁ'গুলোই মোগলাই পরোটার সেই রূপটি গড়ে তোলে, যার সঙ্গে আমরা আজ পরিচিত।

    দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেখাদ্য বিষয়ক গবেষক, রেডিও জকি এবং শৌখিন রাঁধুনি অরিজিৎ মণ্ডলও মনে করেন যে, এই খাবার তার আগের সেই বিশেষ গুরুত্ব কিছুটা হারিয়েছে। তিনি বলেন, “মোগলাই পরোটা একসময় কেবল একটি খাবার ছিল না, বরং তা ছিল এক আবেগের নাম।” কলেজ বা সিনেমা দেখার পর কিংবা গভীর রাতে খাওয়ার অনুষঙ্গ হিসেবে এর জনপ্রিয়তার কথা তিনি স্মরণ করেন।

    অরিজিৎ মণ্ডলের মতে, বর্তমানে রাস্তার ধারের নতুন নতুন সব খাবারের ভিড়ে মোগলাই পরোটার প্রতি মানুষের মনোযোগ কিছুটা কমেছে। তবুও নস্টালজিয়া আর পুরনো খাবারের দোকানগুলোর সুবাদে এই পরোটা আজও টিকে আছে। তিনি বলেন, “চিজ, চিকেন, মাটন, কিমা এবং ফিউশনধর্মী পুর দিয়ে তৈরি নতুন ধাঁচের মোগলাই পরোটা এখন বেশ পরিচিত।”

    উত্তর কলকাতার বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী দেবাশিস মিত্র জানান, বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে মোগলাই পরোটা ছিল তাঁর সান্ধ্যকালীন খাবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “আমার বাড়ির খুব কাছেই মিত্র ক্যাফে। কলেজ থেকে ফেরার পথে এক প্লেট মোগলাই পরোটা কিনে বাড়ি ফিরতাম। বাড়িতে চা তৈরিই থাকত। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে খেতাম সেই পরোটা। এখন শারীরিক সমস্যার কারণে সেটা আর খেতে ভয় পাই। বাড়িতে কম তেলে এটা তৈরি করার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু দোকানের মতো সেই স্বাদ হয় না।”

    তথ্য- দ্য টেলিগ্রাফ
  • Link to this news (আজকাল)