ডাম্পার, লরি-সহ ২৪২ গাড়ি টুলু মণ্ডলের! মিলছে না ডিসিআর তথ্য, নথিতে একাধিক অসঙ্গতি
প্রতিদিন | ০৫ আগস্ট ২০২৬
বীরভূমের কুখ্যাত পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলকে (Tulu Mondal) ঘিরে ক্রমশ বাড়ছে রহস্য! সামনে আসছে একের পর এক কেলেঙ্কারি। তদন্তের সূত্রে এবার আরও গভীরে যাওয়ার প্রস্তুতি পুলিশের। তদন্তের প্রয়োজনে টুলুর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করা ২৪২টি গাড়ি অর্থাৎ ডাম্পার, লরির গত পাঁচ বছরের ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিপ্ট) এবং পরিবহণের সমস্ত তথ্য ভূমি দপ্তরের কাছে তলব করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার ধারণা, এই নথিগুলি হাতে এলে পাথর পরিবহণ, রয়্যালটি প্রদান, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য অনিয়মের প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, টুলু মণ্ডলের (Tulu Mondal) পাথর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসছিল। সম্প্রতি তাঁর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে বিপুল টাকা উদ্ধারের ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে জেলা পুলিশ। টুলু মণ্ডলের বিপুল সাম্রাজ্য কীভাবে? তা জানতে সম্প্রতি তদন্তের গতি বাড়িয়েছে পুলিশ। টুলুর সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার টুলুর সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত সমস্ত গাড়ির গত পাঁচ বছরের পরিবহণ সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন গাড়ি কতবার পাথর বহন করেছে, কত পরিমাণ পাথর পরিবহণ হয়েছে এবং তার বিপরীতে কত রয়্যালটি জমা পড়েছে— সেই সমস্ত বিষয় যাচাই করাই তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কয়েকটি ক্ষেত্রে নথিপত্রে অসঙ্গতির ইঙ্গিত মিলেছে। কোথাও কম পরিমাণ পাথর পরিবহণ দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও সরকারি নথির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। আর সেই কারণে সমস্ত ডিসিআর নথি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে প্রকৃত আর্থিক লেনদেনের হিসাব মিলিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট গাড়ির, চালক এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধি এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
পুলিশের একাংশের মতে, পাঁচ বছরের ডিসিআর তথ্য বিশ্লেষণ করলে শুধু পাথর পরিবহণ নয়, আর্থিক লেনদেনের ধারাবাহিকতাও স্পষ্ট হবে। কারণ এর আগের একাধিক অভিযোগ অনুযায়ী, টুলু মন্ডল অন্য সমস্ত পাথর ব্যবসায়ীদের গাড়ি থেকে নকল ডিসিআরের মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা বেআইনি অর্থ তুললেও তার নিজের গাড়িগুলি এর আওতার বাইরে ছিল। ফলে গাড়ি প্রতি কয়েক হাজার টাকা খরচ কম হওয়ায় টুলু মন্ডলের সঙ্গে এই এলাকায় অন্য কেউ পাথরের ব্যবসার প্রতিযোগিতায় অন্য কেউ এঁটে উঠতে পারত না। ফলে কমদামে পাথর সরবরাহ থেকে সরকারি কাজের বরাত পাওয়া- সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে থাকত টুলু। ফলে এই পাঁচ বছরের ডিসিআরের তথ্য যাচাইয়েত মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, জাল নথি ব্যবহার কিংবা অন্য কোনও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছেন এবং সেগুলি হাতে এলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে এই মামলায় এ দিন ফের আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পেশ করল পুলিশ। ধৃত নইমুদ্দিন মণ্ডল মহম্মদবাজার থানা এলাকার সোঁতশালের বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, নঈমুদ্দিন মন্ডলের সরাসরি টুলু মন্ডলের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকলেও টুলুর বেনামী ব্যবসার অংশীদার হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে তদন্তে। এই মামলায় এর আগে দ্রুত মিনার মন্ডল এবং সীতেশ প্রামাণিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেই নইমুদ্দিনের সন্ধান পায় পুলিশ৷ ধৃতের কাছ থেকে টুলু সংক্রান্ত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে বলে আশাবাদী পুলিশ, তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানানো হয়। আদালত ৬ দিন পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর করেছে বলে জানা গিয়েছে।