একটি পোস্টার। তাকে ঘিরেই হুগলির চুঁচুড়া পুরসভায় চলছে জোর হাসি-ঠাট্টা। কেউ বলছেন, এ তো সিনেমার গল্প। আবার কেউ মুচকি হাসছেন, ‘দাম্পত্যের অভিমান’। কিন্তু সেই পোস্টারের আড়ালে যে লুকিয়ে ছিল অসুস্থতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা আর ভুল বোঝাবুঝির দীর্ঘ ছায়া, তা সামনে আনলেন সুখেন ঘোষের স্ত্রী শ্রাবণী ঘোষ সরকার।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে বিবাহবার্ষিকী। ১৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে পা দিয়েছেন তাঁরা। তাই বিবাহবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে সহকর্মীদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন হুগলি-চুঁচুড়া পুরসভার জল বিভাগের কর্মী সুখেন ঘোষ। কিন্তু বেঁকে বসেন তাঁর স্ত্রী শ্রাবণী। অনুষ্ঠানের আগেই তিনি সবাইকে ফোন করে জানান, অনুষ্ঠান হচ্ছে না। ফলে নির্দিষ্ট দিনে অধিকাংশই যাননি।
এর পরেই পুরসভার দেওয়ালে দেখা যায় একটি পোস্টার। সেখানে লেখা, যাঁরা নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি, তাঁরা যেন ৫০০ টাকা ‘জরিমানা’ দিয়ে পরে আশীর্বাদ করে যান। মুহূর্তে তা ভাইরাল হয়ে যায়। অফিসে শুরু হয় হাসি-ঠাট্টা। অনেকেরই প্রশ্ন ছিল, স্বামী ডাকছেন, স্ত্রী বারণ করছেন—শেষ পর্যন্ত কার কথা শোনা উচিত?
এই বিতর্কের মধ্যেই মুখ খুললেন শ্রাবণী। এই সময় অনলাইনকে ফোনে তিনি জানান, গোটা ঘটনাটাই আসলে ভুল বোঝাবুঝির ফল। তাঁর কথায়, ‘ও হয়তো আমাকে বিবাহবার্ষিকীতে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি কিছুই জানতাম না। পরে জানতে পেরে ওকে বলেছিলাম, এত আয়োজন কেন করলে? অনেক টাকা ধার হয়ে যাবে তো।’
শ্রাবণীর কথায় উঠে এসেছে গত কয়েক মাসের কঠিন বাস্তবও। ডিসেম্বরে তাঁর মা মারা গিয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে হারিয়েছেন বোনকে। অন্যদিকে স্বামী সুখেনও অসুস্থ। গত ডিসেম্বরেই তাঁর হার্ট অ্যাটাক ও মিনি স্ট্রোক হয়। পরে এসএসকেএম (পিজি) হাসপাতালে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে স্টেন্ট বসান চিকিৎসকরা। এর মধ্যে বিবাহবার্ষিকীর আয়োজন করতে চাননি। তাই স্বামীর অজান্তেই সব নিমন্ত্রিতদের ফোন করে আসতে বারণ করে দেন। কিন্তু সুখেন সে সবের কিছুই জানতেন না। তাতেই পোস্টার বিতর্ক।
‘মান-সম্মানের চেয়ে আমার কাছে ওর শরীরটাই বড়’, ধরা গলায় বললেন শ্রাবণী। তাঁর দাবি, স্বামীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা ভেবেই তিনি অনুষ্ঠান বাতিল করতে চেয়েছিলেন। তার উপর দু’জনেই পুরসভার কর্মী হলেও দু’মাস ধরে বেতন মেলেনি বলে অভিযোগ তাঁর। সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন চলছে। ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র। তার পড়াশোনার খরচও তো সামলাতে হয়।
শ্রাবণীর কথায়, ‘পনেরো-কুড়ি জনকে ডাকলে কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু এত জনকে নিমন্ত্রণ করেছিল, আমাদের পক্ষে খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ত।’ তাই একে একে পরিচিতদের ফোন করে অনুষ্ঠানে না আসার অনুরোধ জানান তিনি। শ্রাবণীর দাবি, যাঁদের ফোন করেছিলেন, তাঁরা পারিবারিক পরিস্থিতির কথা জানতেন। কিন্তু সুখেন তখনও নিজের পরিকল্পনায় অটল। বাড়িতে প্যান্ডেল করতে না দেওয়ায় পাশের একটি গোডাউনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মাছ-মাংস-সহ সব খাবারের ব্যবস্থাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অতিথিরা না আসায় সেই বেশিরভাগই নষ্ট হয়।
পুরোটাই করেছিলেন স্ত্রীর অজান্তে। শ্রাবণীর কথায়, ‘আমি বুঝতেই পারিনি এত বড় আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে রাগ করে বাড়ি থেকেও বেরিয়ে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি কার্ডও ছাপানো হয়েছে। আমাকে কিছুই বলেনি।’ আর পোস্টার? স্ত্রীর দাবি, সেটিও তাঁর অজানা ছিল, ‘আমি জানতাম না।’
শেষে সব বিতর্ক সরিয়ে রেখে একটাই কথা বলতে চান তিনি, ‘আমরা ১৭ বছর ধরে একসঙ্গে আছি। এবারেই একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমার কাছে আমার স্বামীই সবচেয়ে বড়। পরিবার নিয়েই আমাকে থাকতে হবে।’ অন্য দিকে, এই বিষয়ে সুখেন ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
একটি পোস্টার হয়তো অনেককে হাসিয়েছে। কিন্তু তার আড়ালে যে একটি পরিবারের অসুস্থতা, আর্থিক চাপ, ভালোবাসা আর ভুল বোঝাবুঝির গল্প লুকিয়ে ছিল, তা শ্রাবণীর বক্তব্যেই স্পষ্ট।