এই সময়, আলিপুরদুয়ার: অতিথি নয়, সে ঘরের লোক। কিন্তু ক্লাউডেড লেপার্ডের দেখা আর ক'জন পায়! উত্তরবঙ্গে প্রথমবার তার 'সাইটিং' হয়েছিল ১৯১১ সালে। আজ যেখানে বক্সা ভাইগার রিজ়ার্ভ, সেই এলাকাতেই হান্টাপাড়ায় শতবর্ষ আগে মারা পড়েছিল একটি ক্লাউডেড লেপার্ড। পরে আর একটির দেখাও মিলেছিল। সে আবার চিতাবাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে মারা পড়েছিল সামসিংয়ে।
শতবর্ষ পেরিয়ে সেই মুখচোরা ক্লাউডেড লেপার্ডের শুমারি শুরু করতে চাইছে রাজ্য বন দপ্তর। আইইউসিএন রেড লিস্টের বিপন্ন তালিকায় থাকা এই ক্লাউডেড লেপার্ডদের নিয়ে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পাহাড়ি এলাকায় টানা পাঁচ বছর ধরে গবেষণা চালিয়েছে তারা। মঙ্গলবার বিশ্ব ক্লাউডেড লেপার্ড দিবসে বনাধিকারিকরা জানাচ্ছেন, গত দশ বছরে বক্সা এলাকায় এরা চোরাশিকারিদের নাগালে আসেনি। নেওড়া ভ্যালি ও জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানেও গত দশ বছরে ক্লাউডেড লেপার্ডের হত্যার ঘটনা ঘটেনি।
কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের তরফেও এ দিন ক্লাউডেড লেপার্ড সংরক্ষণ নিয়ে একটি রিপোর্ট সামনে এসেছে, যেখানে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি অরণ্যকে এদের বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বক্সার জঙ্গল ছাড়াও নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান, সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান, মহানন্দা অভয়ারণ্য, জলদাপাড়া অভয়ারণ্য-সহ আলিপুরদুয়ার টাউনের কাছাকাছি এলাকাতেও এদের দেখা মিলছে। নেওড়ায় আশির দশকের প্রথম দিক থেকে ক্লাউডেড লেপার্ড দেখা যায়। ১৯৯১-এ একটি নেওড়ায় একটি ক্লাউডেড লেপার্ডকে উদ্ধার করে ঘেরাটোপ এলাকায় রাখা হয়েছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল বাদল।
১৯৯৩-এ সেই বাদলের মৃত্যু হয়। তবে তার পরেও উত্তরবঙ্গের বহু জঙ্গলে এদের দেখা মিলেছে। সাম্প্রতিক রেকর্ডেও আশার আলো থাকছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে বসানো ক্যামেরা ট্র্যাপে বক্সা, নেওড়া, মহানন্দা ও জলদাপাড়ার সংরক্ষিত নিয়মিত ছবি উঠেছে ক্লাউডেড লেপার্ডের।
গত ফেব্রুয়ারি মাসেও বক্সায় প্রতিস্থাপন করা একাধিক ক্যামেরায় ক্লাউডেড লেপার্ডের একাধিক ছবি ধরা পড়েছে। এক বনকর্তা বলেন, 'এদের নিয়ে প্রথম পর্বের গবেষণা শেষ করে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে ওই প্রজাতির বন্যপ্রাণীদের সংখ্যা জানতে তৎপর হয়েছি আমরা। খুব তাড়াতাড়ি ক্লাউডেড লেপার্ডদের শুমারি শুরুর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ যে কোনও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের সংখ্যা বের করাটা খুবই জরুরি। শিকারের কারণে সারা বিশ্বে গত দু'দশকে ক্লাউডেড লেপার্ডদের সংখ্যা কমেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বক্সা, জলদাপাড়া ও নেওড়ায় বাস্তুতন্ত্রের 'ইন্ডিকেটর স্পিসিস' ক্লাউডেড লেপার্ডদের পরিস্থিতি জানা প্রয়োজন। কোনও জঙ্গলে এদের অস্তিত্ব মেলার অর্থই হলো সেখানকার বাস্তুতন্ত্র একদম ঠিক রয়েছে।'
ক্লাউডেড লেপার্ডদের গড় ওজন ১৩ থেকে ২৩ কেজি। পায়ের গোড়ালি ঘোরাতে পারে বলে এরা উঁচু গাছ থেকে শিকারের নাগাল পেতে সরাসরি মাটির দিকে মাথা ঝুলিয়ে চোখের নিমেষে নেমে আসতে পারে। এদের ক্যানাইন দু'টি আকারে অনেকটা বড় হওয়ায় এরা শিকারে খুবই দক্ষ। শিকারের খোঁজে এরা গাছের মগডালে উল্টে লটকে থাকতে পারে। ন্যাফ মুখপাত্র অনিমেষ বসু বলেন, 'ক্লাউডেড লেপার্ডরা উত্তরবঙ্গের তিন জঙ্গলের দুর্লভ সম্পদ। তাদের সংরক্ষণের প্রশ্নে বনদপ্তরকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।'