এই সময়, নয়াদিল্লি: কী হবে এনসিপিআইয়ে যোগদানকারী ২০ জন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদের? তাঁরা কি বিজেপিতে মিশে যাবেন? নাকি অনিশ্চয়তার দোলাচলে বিদ্রোহী শিবির থেকে একাধিক এমপি ফিরে যাবেন কালীঘাটের ছত্রচ্ছায়ায়? কালীঘাট শিবির থেকে কি নতুন কেউ যুক্ত হবেন এনসিপিআইয়ে। এই ক’টি প্রশ্নে গত এক–দেড় সপ্তাহ ধরে ধোঁয়াশা ছিল সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় সমেত তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদের মধ্যে। মঙ্গলবার দিল্লিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে বৈঠকের পরে এই অনিশ্চয়তা কেটে গিয়েছে বলে দাবি বিদ্রোহী সাংসদদের।
দিল্লির বঙ্গভবনে এ দিনের বৈঠকের আগেই বিদ্রোহী শিবিরে তাল কাটার পরিস্থিতি নতুন করে তৈরি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পৌরোহিত্যে এনডিএ–র ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠকে এনসিপিআইয়ের তিন সংখ্যালঘু সাংসদ— আবু তাহের, খলিলুর রহমান ও ইউসুফ পাঠানের অনুপস্থিতিতে। শুধু তাই নয়, আবু তাহের সাংবাদিকদের এও বলেন, ‘আমরা তিন জন এই বৈঠকে যাইনি। আমরা বিজেপিতেও নেই, এনডিএ–তেও নেই। বাংলার মানুষ, বিশেষত সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে যদি কোনও বিল আনা হয়, তা হলে সেই বিলে আমরা সমর্থনও জানাব না৷ তবে রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রীর (শুভেন্দু) সঙ্গে বৈঠকে আমরা থাকব।’
এর আগেও এই তিন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে ফিরতে পারেন বলে জল্পনা চলছিল। যদিও এ দিন দুপুরে কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছে শুভেন্দু প্রথমেই বৈঠকে বসেন বিদ্রোহী ১৯ সাংসদের সঙ্গে। অভিনেতা–সাংসদ দেব ছাড়া বাকি ১৯ জন বিদ্রোহী এমপি–ই ছিলেন এই বৈঠকে। ছিলেন তৃণমূল ত্যাগ করে বিজেপির হয়ে রাজ্যসভায় যাওয়া তিন এমপি সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইকও। ভূপেন্দ্র ছাড়াও বৈঠকে ছিলেন ঝাড়খণ্ডের গোড্ডার বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। সূত্রের দাবি, এই বৈঠকে শুভেন্দু, ভূপেন্দ্ররা আশ্বাস দিয়েছেন, এনসিপিআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইয়ে গিয়ে এই সাংসদরা কেউ ভুল করেননি বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই বৈঠকের পরে তৃণমূল–ত্যাগী বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এনসিপিআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুলের প্রতীকের বিষয়টি কার অধীনে থাকবে, তার মীমাংসা হওয়ার পরেই৷ ভূপেন্দ্র যাদব নিজে তাঁকে এ কথা জানিয়েছেন বলেও দাবি সুদীপের৷ তাঁর কথায়, ‘বঙ্গভবনে যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব ঢোকেন, তখনই তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, এনসিপিআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনারা কী ভাবছেন? উনি জানিয়েছেন, জোড়াফুল প্রতীক সংক্রান্ত বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া মাত্রই এই বিষয় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে৷’
জোড়াফুল প্রতীকটি কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে কিন্তু বিদ্রোহী এমপি–রা যাননি। গিয়েছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বিধায়ক শিবির। ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ঘাসের উপরে জোড়াফুল প্রতীক কার দখলে থাকবে— কালীঘাট শিবির নাকি বিদ্রোহী শিবির, এ নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি কমিশন। তবে এই প্রতীক তাঁদের হাতছাড়া হতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা আগেই শোনা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়। এ দিন ভূপেন্দ্ররা যে আশ্বাস দিয়েছেন, তাতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, জোড়াফুল প্রতীকটি বিদ্রোহী বিধায়কদের দখলে গেলে তখন সুদীপ, কাকলিদের মতো বিদ্রোহী এমপি–রাও সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবেন।
সূত্রের দাবি, এ দিনের বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী তিন সংখ্যালঘু সাংসদকেও বুঝিয়েছেন, এনসিপিআই হলো এনডিএ-এর অংশ৷ তাই জোট শরিকদের রীতি মেনেই তাঁদের চলতে হবে৷ কিন্তু শুভেন্দুর আশ্বাসে কি এই সংখ্যালঘু সাংসদরা ভরসা পেলেন? তাঁরা নিজেরা এ নিয়ে কোনও মন্তব্য না–করলেও সুদীপ বৈঠকের শেষে বলেন, ‘এই সংখ্যালঘু সাংসদরা এক–এক জনের সামনে এক এক রকম কথা বলছেন৷ মুখ্যমন্ত্রীর সামনে অন্য কথা বললেন৷ এক জন তো ১৬ পাতার দস্তাবেজও জমা দিলেন মুখ্যমন্ত্রীকে৷ যখন ছবি তোলা হচ্ছিল, তখন ইউসুফ পাঠানকে কাছে ডেকে নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে৷’ শতাব্দীর দাবি, ‘এই তিন জন তো মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও এসেছেন৷ ওঁদের কিছু বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে৷ সেটাকে মুখ্যমন্ত্রী সম্মান দিচ্ছেন৷ ওঁরা নিজেদের কথা বলতে পারছেন৷’ আর এক এনসিপিআই সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘ওঁরা আমাদের সঙ্গেই আছেন৷ আমরা ২০ জন ছিলাম, ২০ জনই আছি৷ সংখ্যাটা পরে বাড়তেই পারে৷ বলতে পারছি না, ক’জন আমাদের সঙ্গে আসবেন, তবে সংখ্যাটা বাড়তেও পারে৷’ মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদার বলেন, ‘এনসিপিআই এনডিএকে আগেই সমর্থন করেছে। তিন জন সাংসদের নিজস্ব কিছু সমস্যা ছিল। তাঁরা সমস্ত কিছু মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। পরিষ্কার কথা হয়েছে। তাঁরা আমাদের সঙ্গেই আছেন।’
সূত্রের দাবি, এনসিপিআই সাংসদরা প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকা উন্নয়নের কাজ থমকে থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে৷ শুভেন্দু আশ্বাস দিয়েছেন, সংসদের চলতি বাদল অধিবেশনের পরে কলকাতায় নবান্নে প্রতিটি জেলার বিধায়ক ও সাংসদদের সঙ্গে একটি যৌথ বৈঠক করবেন তিনি৷ এই বৈঠকের মাধ্যমেই তৃণমূল স্তরে সমন্বয় সাধনের কাজ হবে৷
সূত্রের খবর, এনসিপিআই সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এনসিপিআইয়ের এই ২০ জন যে এলাকার সাংসদ, সেই সংসদীয় কেন্দ্রে যাঁরা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাননি, তেমন পাঁচ হাজার জনকে এই সামাজিক প্রকল্পের টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা হবে৷ বাপির কথায়, ‘উন্নয়নের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে আছেন। আগে যে কথা দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করেছেন এ বারও।’ রচনার কথায়, ‘রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত চর্চা হয়েছে। দারুণ বৈঠক হয়েছে।’
বিজেপি সূত্রের দাবি, এ দিন ১৯ জন এনসিপিআই সাংসদ মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, তৃণমূলের পরিচয় থেকে বেরিয়ে এলেও নিচুতলার বিজেপি কর্মীদের সহযোগিতা এখনও তাঁরা পাচ্ছেন না। আগের মানসিকতা নিয়েই তাঁদের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন নিচু তলার বিজেপি কর্মীদের একাংশ। পুলিশ–প্রশাসনের দিক থেকেও যথেষ্ট সহযোগিতা মিলছে না বলে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুযোগ করেছেন বিদ্রোহী এমপি–রা। এমনও অভিযোগ উঠছে, এলাকায় যেতে পারছেন না জগদীশ বসুনিয়ার মতো সাংসদ। মুখ্যমন্ত্রী গোটা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে দাবি এনসিপিআইয়ের৷
এই বৈঠকের পরে সংসদ ভবনে গিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ পরে তিনি জানান, বাংলার সার্বিক বিকাশ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়েই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে৷ তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে আরও কয়েকজন সাংসদ এনসিপিআই শিবিরে যোগদান করতে পারেন— এই জল্পনা উসকে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ইয়ে তো সির্ফ ঝাঁকি হ্যায়, আগে অউর ভি বাকি হ্যায়৷’
যদিও বিদ্রোহী শিবির ও বিজেপি নেতৃত্বকে বিঁধে মঙ্গলবার মমতা ফেসবুক লাইভে বলেন, ‘ভয় দেখিয়ে, চমকে ভাবছেন যে, সরকারি দল আপনারা ঠিক করবেন আবার বিরোধী দলও আপনারা–ই ঠিক করবেন? তার মানে বিরোধী বলে কেউ থাকবে না? এটা শুধু লজ্জার নয়, নিন্দার ঝড় উঠবে। অপেক্ষা করুন, এটাই ভবিতব্য।’ তাঁর সংযোজন, ‘(আমাদের) কর্মীদের হাজার হাজার কেস দেওয়া হয়েছে। তাঁরা জানেন না, তাঁদের অপরাধ কী? জোর করে পঞ্চায়েত–পুরসভাগুলো দখল করা হয়েছে। জেলা পরিষদ দখল করা হয়েছে।’