এই সময়: যে সময়ে তোলাবাজির বিরুদ্ধে সরব বিজেপি–র নেতা–মন্ত্রীরা, তখন তৃণমূল নেত্রী, বিধাননগর পৌরনিগমের প্রাক্তন মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা তোলা চাওয়ার অভিযোগ উঠল। কৃষ্ণার বিরুদ্ধে এই প্রথম এই ধরনের অভিযোগ সামনে এল।
অনাবাসী ভারতীয় দীপঙ্কর সেনগুপ্ত–র আইনজীবী বিকাশ কোঠারি ৩০ জুলাই বিধাননগর পূর্ব থানায় এই তোলাবাজির অভিযোগ এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সি জে ব্লকে দীপঙ্করের বাড়ির একাংশ জোর করে দখল করে রেখেছেন কৃষ্ণা–ঘনিষ্ঠ এক মহিলা। সেই বাড়ি ছাড়তে বললে কৃষ্ণা এক কোটি টাকা চেয়েছেন।
রাজ্যে পালাবদলের পরে তৃণমূলের বহু নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধেই এই তোলাবাজির অভিযোগ উঠেছে এবং তা নিয়ে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে পুলিশ। বিকাশের অভিযোগ, তৃণমূলের আমলেই কৃষ্ণা বাড়ি খালি করার জন্য ওই টাকা চেয়েছিলেন। থানায় লিখিত অভিযোগে বিকাশ জানিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বৃদ্ধ অনাবাসী দীপঙ্কর খানিকটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন নতুন কোনও ‘ঝামেলা’ ছাড়া এ বার বাড়ি খালি করতে পারবেন। অথচ বিজেপি জমানাতেই গত জুনে কৃষ্ণা অন্য একটি ফোন (নিজের নয়) থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে তাঁর কাছ থেকে আবার এক কোটি টাকা চেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিকাশ। এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর রুজু করেছে।
মঙ্গলবার এই অভিযোগ সামনে আসার পরে কৃষ্ণার সঙ্গে বেশ কয়েকবার ফোনে যোগা়যোগ করা হলে কানেক্ট করা যায়নি। তাঁর মোবাইলে পাঠানো বার্তারও জবাব মেলেনি। আর ‘কৃষ্ণা–ঘনিষ্ঠ’ যে মহিলার বিরুদ্ধে দীপঙ্করের বাড়ি দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে, সেই সৃজনী ভট্টাচার্য মুখোপাধ্যায়কে মঙ্গলবার রাতে ফোন (বিকাশের করা অভিযোগপত্র থেকে পাওয়া নম্বরে) করা হলে তিনি বলেন, ‘আজ কথা বলতে পারব না। কাল যা বলার বলব।’
দীপঙ্কর সপরিবার পর্তুগালে থাকেন। বিকাশ পুলিশকে জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে এলে দীপঙ্কররা সি জে ব্লকের দোতলা বাড়িতেই ওঠেন। অন্য সময়ে সেই বাড়ি খালিই পড়ে থাকে। কয়েক বছর আগে, এক আত্মীয়ের অনুরোধে সৃজনীকে ওই বাড়ির একতলার একাংশে থাকতে দিয়েছিলেন দীপঙ্কর। ২০২৪–এ তিনি দেশে এসে সৃজনীকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন। জানা যায়, সৃজনী নিজে সবসময়ে ওই বাড়িতে থাকতেন না। বেশিরভাগ সময়ে তালা দিয়ে রাখতেন। অভিযোগ, তাঁকে বাড়ি ছাড়তে বললে সৃজনী তখন কৃষ্ণার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা জানিয়ে দীপঙ্করকে রীতিমতো ভয় দেখান।
২০২৫–এর শেষের দিকে বিকাশ সল্টলেকের ওই বাড়িতে সৃজনীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁর সঙ্গে দুর্বব্যহার করা হয় বলে আইনজীবীর অভিযোগ। পুলিশকে লিখিত ভাবে তিনি জানিয়েছেন, যে অংশে সৃজনীকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল, ওই অংশে থাকা দীপঙ্করের আসবাব–সহ অন্য সামগ্রী বিক্রি করে দেন সৃজনী। গত ডিসেম্বরে বিকাশের কাছে একটি ফোন আসে। তাঁর দাবি, নিজেকে বিধাননগরের মেয়র পরিচয় দিয়ে কৃষ্ণা তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তখনই ওই বাড়ি সৃজনীর কাছ থেকে ছাড়ানোর জন্য এক কোটি টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ।
পুলিশের কাছে দায়ের করা দীপঙ্করের অভিযোগ অনুযায়ী, কৃষ্ণা তখন বলেছিলেন, আপাতত পাঁচ লক্ষ টাকা সি জে ব্লকের ওই বাড়িতে গিয়ে তাঁর লোকের হাতে দিয়ে আসতে। না হলে ওই বাড়িতে ঢুকলে চরম বিপদ হবে। তৃণমূলের জমানায় গত ডিসেম্বরে পুলিশকে এই ঘটনার কথা জানিয়েও কোনও ফল হয়নি বলে বিকাশ জানিয়েছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, উপায় না দেখে তখন পাঁচ লক্ষ টাকা ওই বাড়িতে গিয়ে, সৃজনীর উপস্থিতিতেই কৃষ্ণার লোকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
গত এপ্রিলে দীপঙ্কর আবার সৃজনীকে বাড়ি ছাড়তে বলেন। অভিযোগ, তখন সৃজনী জানান, এক কোটি টাকা না পেলে তিনি বাড়ি ছাড়বেন না। গত জুনে সৃজনী তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বিকাশকে কল করেন। সেই কলে আবার কথা বলেন কৃষ্ণা। ফের এক কোটি টাকা দাবি করেন তিনি। যখন বলা হয় যে পাঁচ লক্ষ টাকা ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে, তিনি বলেন, যা দিয়েছেন তা ভুলে যান। পুরো টাকা না পেলে বাড়ির কথা ভুলে যান।
রাতে এই বিষয়ে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার অমিত কুমার রাঠোরকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। মোবাইলে পাঠানো বার্তারও জবাব দেননি। কালীঘাট তৃণমূল শিবিরের মুখপাত্র ও বিধায়ক কুণাল ঘোষের সঙ্গেও মোবাইলে যোগাযোগ করা যায়নি।