এই সময়: ‘এক সময়ে সবাই মৃত্যু–ভয়ে চিৎকার করছিলাম। চোখের সামনে আমার বোন সিট থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ে। মায়ের মাথা ঠুকে যায় ছাদে। আমার হাতে থাকা ফোন উড়ে অন্যদিকে চলে যায়। আমি তো কাঁদতে শুরু করে দিই। ভেবেছিলাম মরেই গেলাম বুঝি’ — ফ্লাইট থেকে নামার পরেও আতঙ্কের ছবি স্পষ্ট ইতালির ভিভিয়ানার চোখে–মুখে। সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনও আমি ভালো করে শুনতে পাচ্ছি না। কান কটকট করছে।’
থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে দিল্লি ফিরছিলেন ভিভিয়ানা। পথে মাঝ আকাশে মঙ্গলবার আচমকাই ৩০০ ফুট নীচে নেমে আসে (অনেকটা পড়ে যাওয়ার মতো করে) এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান। তাতে ক্রু ও যাত্রী মিলিয়ে ১৪ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভিভিয়ানার মা–বোনও। এক যাত্রীর আঘাত গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
পাইলটরা বলছেন, মূলত দু’টি কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এক, খারাপ আবহাওয়া। সেখানে বিপরীতমুখী হাওয়ার মধ্যে পড়লে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমান আচমকা অনেকটা নীচে নেমে আসতে পারে। তবে, এখন প্রতিটি ফ্লাইটের আগে এন–রুটে আবহাওয়ার হাল হকিকত জেনে নেন পাইলট। গন্তব্যের পথে খারাপ আবহাওয়া থাকলে তা এড়িয়ে যান তাঁরা। ফলে, মঙ্গলবার জেনেশুনে দুর্যোগের মধ্যে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়া, মানতে নারাজ পাইলটেরা।
তাঁরা বলছেন, আকাশে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানের উপর দিয়ে তুলনায় বড় কোনও বিমান উড়ে যাওয়ায় উত্তাল হয়ে ওঠে ওই এলাকার হাওয়া। তাতেই নিয়ন্ত্রণ হারান পাইলট এবং দুম করে নীচে নেমে আসে বিমানটি। বিমান পরিবহণের ভাষায় এই ‘ফ্রি ফল’–কে ‘ওয়েক টার্বুল্যান্স’ বলে।
এখনও পর্যন্ত এই ‘ওয়েক টার্বুল্যান্স’–এর ভয়ঙ্করতম উদাহরণ হয়ে রয়ে গিয়েছে আরব সাগরের উপরে ২০১৭–র ৭ জানুয়ারির ঘটনা। ৩৪ হাজার ফুট উপর দিয়ে সে দিন উড়ে যাচ্ছিল বিজ়নেস জেট। তুলনায় ছোট বম্বার্ডিয়ার বিমান। তার এক হাজার ফুট উপর দিয়ে উল্টোমুখে এমিরেটসের বিশাল এয়ারবাস ৩৮০ বিমান চলে যাওয়ার প্রায় ৫০ সেকেন্ড পরে বিজ়নেস জেটের পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। হু হু করে নীচে নামতে থাকে সেই বিমান। কার্যত ওলটপালট খেয়ে ১০ হাজার ফুট নীচে নেমে আসার সময়ে বিমানের দু’টি ইঞ্জিনই বন্ধ হয়ে যায়। ওই অবস্থায় ইঞ্জিন অন করে দুই পাইলট সেই ছোট বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। সে দিনও বিমানে থাকা একাধিক যাত্রী মারাত্মক জখম হন। অভিজ্ঞ পাইলটদের কথায়, ‘এ ক্ষেত্রে পাইলটদের কিছু করার থাকে না। আকাশে বড় বিমানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এরকম ঘটনা প্রায়শই ঘটে। তবে, সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হলেও পাইলটেরা শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন বিমান।’
ফুকেট থেকে মঙ্গলবার যে এয়ারবাস ৩২০ বিমানটি আসছিল সেটি বিজ়নেস জেট–এর থেকে বড়। পাইলটদের দাবি, এই বিমানের মাথার উপর দিয়ে এয়ারবাস ৩৮০ বা ৩৫০ অথবা বোয়িং ৭৭৭, ৭৮৭–এর মতো বড় কোনও বিমান চলে যাওয়ায় এলোমেলো হাওয়া বইতে শুরু করে। এক সিনিয়র পাইলটের কথায়, ‘নদী বা সমুদ্রে বড় কোনও জাহাজ চলে যাওয়ার পরে যে ঢেউ তৈরি হয়, তাতে ছোট নৌকো পড়লে যে হাল হয়, এ ক্ষেত্রে সেরকমই হয়।’ উপর–নীচে দুই বিমানের মধ্যে কমপক্ষে এক হাজার ফুটের ব্যবধান থাকলেও এই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এ দিন দিল্লিতে নামার আগে পাইলট ঘটনার কথা বিমানবন্দরকে জানান এবং ফ্লাইট ল্যান্ড করার আগেই সেখানে প্রস্তুত রাখা হয় চিকিৎসকদের। সকাল সওয়া ১১টা নাগাদ দিল্লিতে নামার পরে যাত্রীদের চিকিৎসা শুরু হয়। সূত্রের খবর, কোনও এক যাত্রীর কানের পর্দা নাকি ফেটে গিয়েছে। তবে আহত সকলের চিকিৎসা চলছে বলে এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, এই দুর্যোগের কথা আগাম জানতে পারেননি তাঁরা। অনেকেরই সিট–বেল্ট পরা ছিল না। এর ফলে, বিমানটি হু হু করে নীচে পড়ে যাওয়ার সময়ে অনেকেই সিট থেকে ছিটকে পড়ে যান। কেবিনের মাথায় থাকা কম্পার্টমেন্ট থেকে লাগেজ পড়তে শুরু করে। এক যাত্রীর দাবি, ‘আচমকাই বিমানটি একেবারে উপুড় হয়ে যায়। যাত্রীরা ছিটকে পড়েন। অনেকের মাথা ছাদে ঠুকে যায়।’ প্রায় ১০০ জন যাত্রী ছিলেন ফ্লাইটে এবং ঘটনার সময়ে অনেকে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিলেন বলেও জানা গিয়েছে। তাঁদের দাবি, পুরো দুর্যোগ দুই থেকে তিন মিনিট চলে।
অনেক যাত্রী এই কারণে এয়ার ইন্ডিয়ার উপরে খেপে গিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক জন মামলা করারও হুমকি দেন। যদিও নেটিজ়েনরা পাল্টা রসিকতা করে লিখেছেন, ‘আবহাওয়ার জন্য এয়ার ইন্ডিয়া তো দায়ী নয়। আপনি বরং নেচারের বিরুদ্ধে মামলা করুন।’