দুর্গাপুরে রক্ত বিক্রি চক্রের খোঁজ। দুর্গাপুর স্টিল টাউনশিপে অবস্থিত একটি স্কুলের ছাত্রদের টাকা দিয়ে রক্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠল। নথিতে নাবালকদের ‘প্রাপ্ত বয়স্ক’ বলে দেখানো হতো। হাতে ২০০-৩০০ টাকা গুঁজে দিয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে রক্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগ। দুর্গাপুরের নামকরা এক বেসরকারি হাসপাতালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। আধার কার্ডের বয়স না দেখেই কি রক্ত নেওয়া হতো? প্রশ্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার। দুর্গাপুর থানায় এ নিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন কয়েকজন অভিভাবক। এর পরেই বিষয়টি সামনে আসে। আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটের সিপি প্রণব কুমার সংবাদমাধ্যমে জানান, অভিযোগ জমা পড়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক মহম্মদ ইউনুসও।
গত কয়েক দিনে রাজ্যের বিভিন্ন বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কে তল্লাশি চালিয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর। কলকাতা থেকে জেলা, খতিয়ে দেখা হয়েছে বিভিন্ন ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকাঠামো ও নথিপত্র। এই আবহে এ বার দুর্গাপুরের বেসরকারি স্কুলের কিশোরদের টাকা দিয়ে তাদের রক্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠল। যাদের থেকে রক্ত নেওয়া হয়েছে, তারা অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির পড়ুয়া বলেই খবর। অভিযোগ, আধার কার্ডের বয়স বিকৃত করে ১৮ বছর দেখিয়ে রক্ত নেওয়া হয়েছে। এমন চক্রের খোঁজ মেলায় চোখ কপালে উঠেছে প্রশাসনের।
ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দেবযানী বোসের কথায়, ‘আমরা গত শুক্রবার জানতে পারি, আমাদের স্কুলের কিছু পড়ুয়া দুর্গাপুরের একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে রক্ত দিচ্ছে। ওদের বয়স কম। ওরা তো রক্ত দিতে পারে না। শনিবারই অভিভাবকদের ডাকি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলি। তাঁরাও অবাক। এর পরে আমরা পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, মাথা পিছু ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ওরা যদি আবার কাউকে নিয়ে যায় তাদের ১০০ টাকা কমিশন দেওয়াও হয়। যে ছেলেটি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে গ্রুপটা তৈরি করছে, সে নাকি আরও বেশি টাকা পায়। নাম করা হাসপাতাল। ওরা কি আধার কার্ডের বয়সও দেখে না? কোনও প্রশ্ন করে না?’
বেসরকারি ওই হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপার দেবাশিস ঘোষ বলেন, ‘আজ সকালে পুলিশের ডিসি ও জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক কয়েক জনের নাম পাঠিয়েছিলেন রক্তদানের বিষয়ে। ব্লাডব্যাঙ্কে গিয়ে আমরা দেখেছি। প্রত্যেকের বয়স ১৮ বছর লেখা আছে। কেউ যদি আধার কার্ড ট্যাম্পার করে বয়স বাড়িয়ে এই কাজ করে, সে ক্ষেত্রে হাসপাতালের কী করার আছে?’
রক্তদাতা এক ছাত্রের মা বলেন, ‘ওই হাসপাতালের রক্ত দেওয়া সংক্রান্ত একটা সার্টিফিকেট দেখি ছেলের ব্যাগে। তাতে ওর বয়স ১৮ প্লাস লেখা। ছেলের তো ১৮ হয়নি। আমি অবাক। ছেলেকে জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, একজনের রক্তের খুব দরকার ছিল, তাই দিয়েছি। আমি আবার ওকে বোঝালাম এটা দিবি না। তোর বয়স হয়নি, এটা অপরাধ। এখন শুনছি অন্য কথা।’
রক্ত বিক্রি, প্লাজ়মা চক্র নির্মূল করতে ময়দানে নেমেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘জোর করে রক্ত নেওয়া, লোভ দেখিয়ে রক্ত নেওয়ার মতো অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে বলেই আমরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেগুলি আছে, ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিকে বিরত থাকতে বলেছি। আমরা অনেক সংযত আছি। কারণ প্রতিটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কে বহু মানুষ কাজ করেন। সামনে উৎসবের মরশুম আসছে। আমরা চাই না উৎসবের মরশুমের আগে কারও কাজ চলে যাক। তবে আমাদের এই মহানুভবতাকে দুর্বলতা ভাববেন না। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য দপ্তর কড়া, কঠিন পদক্ষেপ করবে। একটি ব্লাড ব্যাঙ্ক বন্ধ করেছি। আমার অবাক লাগছে অনেকে তার পরেও থামছে না। নিয়মের বলয়ে থাকুন। না হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দুর্গাপুরে রক্ত সংগ্রহের ঘটনায় কী ধরনের বেআইনি কাজ হয়েছে?
নাবালক স্কুলছাত্রদের আধার কার্ড ট্যাম্পারিং বা পরিবর্তন করে বয়স ১৮ দেখিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বিনিময়ে রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনকী নতুন রক্তদাতা আনলে ১০০ টাকা কমিশন দেওয়ার লোভও দেখানো হয়েছে।
ঘটনাটি কী ভাবে প্রথম প্রকাশ্যে আসে?
স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দেবযানী বোস কয়েকজন ছাত্রের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরে অভিভাবকদের খবর দেন। এক ছাত্রের ব্যাগে ১৮+ লেখা রক্তদানের সার্টিফিকেট দেখে অভিভাবকরা দুর্গাপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে বক্তব্য কী?
হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপার দেবাশিস ঘোষের দাবি, পেশ করা নথি অনুযায়ী রক্তদাতাদের বয়স ১৮ বছরই লেখা ছিল। কেউ যদি আধার কার্ড ট্যাম্পার করে বয়স বাড়িয়ে আনে, তবে তা শনাক্ত করা হাসপাতালের পক্ষে সম্ভব নয়।
রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর ও প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটের সিপি এবং জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক ঘটনার তদন্ত শুরু করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, নিয়ম অমান্যকারী বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলোর বিরুদ্ধে কঠিন আইনি পদক্ষেপ করা হবে।