• বাস্তবের নায়ক, নিজের লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দেন কৃষককে, বন্যার স্রোতে তলিয়ে মৃত সেই রাজেশের দেহ উদ্ধার
    এই সময় | ০৬ আগস্ট ২০২৬
  • সব নায়কের জন্ম সিনেমার পর্দায় হয় না। কেউ কেউ নিঃশব্দে মানুষের জীবন বাঁচিয়ে ভিড়ে মিশে যান। এমনকী নিজের জীবন দিয়েও। কেরালার আর রাজেশ (৩৬) তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

    বন্যার উত্তাল স্রোতের মধ্যে এক বৃদ্ধকে নিজের লাইফ জ্যাকেট খুলে পরিয়ে দিয়েছিলেন রাজেশ। সেই বৃদ্ধ প্রাণে বেঁচে গেলেও বন্যার জলের স্রোতে তলিয়ে যান রাজেশ নিজে। তিন দিন তল্লাশির পরে মঙ্গলবার উদ্ধার হয়েছে তাঁর দেহ। অবশ্য ততক্ষণে তাঁর আত্মত্যাগের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে।

    তিরুবনন্তপুরমের কল্লিয়ুরে বাড়ি রাজেশের। পেশায় সাঁতারের প্রশিক্ষক। র‌্যাপেলিংয়ের দড়। যে কোনও দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। উদ্ধারকাজে হাত লাগান। নিছকই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। ২০১৮-র ভয়াবহ বন্যা, ২০২৪-এ ওয়ানাডের ভূমিধস — সর্বত্র বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিপদ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়া যেন তাঁর স্বভাব।

    গত ১ অগস্ট প্রবল বর্ষণে ফুলেফেঁপে উঠেছিল কান্নুরের কারিয়াঙ্গোড়ে নদী। চারিদিকে বন্যার জল। আচমকা ভূমিধসের খবর শুনে নিজের কফি বাগানে গিয়েছিলেন কৃষক বেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে আসে হড়পা বান। একটা দ্বীপে আটকে পড়েন তিনি। সেই খবর শুনে শিবিন ও জিতেনকে সঙ্গে নিয়ে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন রাজেশ। উত্তাল নদী সাঁতরে পৌঁছে যান বেনির কাছে। শুরু হয় ফিরে আসার লড়াই।

    ফেরার পথটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন। দড়ি ধরে তীরে ফিরছিলেন সবাই। ঠিক তখনই প্রবল স্রোতে কেঁপে ওঠেন বেনি। জলের তোড়ের সামনে যেন কিছুতেই স্থির থাকতে পারছিলেন না তিনি। বিপদ বুঝে এক মুহূর্ত দেরি করেননি রাজেশ। নিজের শরীর থেকে লাইফ জ্যাকেট খুলে বেনির গায়ে পরিয়ে দেন। হয়তো জানতেন, এরপর তাঁর নিজের বিপদ বাড়বে। তবু দ্বিধা করেননি।

    কয়েক সেকেন্ড মাত্র। নদীর পাড় প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা। হঠাৎই হাত ফসকে যায়। প্রচণ্ড স্রোতে খড়কুটোর মতো তলিয়ে যান রাজেশ। কৃষক বেনি প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু যে মানুষটি তাঁকে নতুন জীবন দিলেন, তিনি হারিয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য।

    রাজেশ ছিলেন ‘অ্যাডভেঞ্চার ডিজাস্টার সোসাইটি’-র সদস্য। শুধু উদ্ধারকাজই নয়, নতুন প্রজন্মকে দড়ি ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান, সাঁতার এবং জলপথে কী ভাবে নিরাপদে যাতায়াত করতে হয়, তার প্রশিক্ষণও দিতেন। সবাই জীবনে নায়ক হয়ে উঠতে পারেন না। রাজেশ পারলেন। একজন মানুষ হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

  • Link to this news (এই সময়)