• ‘আমি মুজিব কন্যা বলছি, ডিসেম্বরেই ফিরব’, দিল্লির সংবাদসভায় হুঙ্কার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার
    প্রতিদিন | ০৬ আগস্ট ২০২৬
  • দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে ভারচুয়ালি বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রবল ছাত্র বিক্ষোভের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে হয় মুজিবকন্যাকে। বুধবার, ৫ আগস্ট তথাকথিত ছাত্র বিপ্লবের বর্ষপূর্তিতে জনসমক্ষে প্রথমবার সরাসরি বক্তব্য রাখছেন তিনি। বক্তৃতার শুরুতেই দৃপ্তকণ্ঠে হাসিনা বলেন, “আমি মুজিব কন্যা বলছি…। ওরা আমাকে জেলে ভরতে পারে। মিথ্যে মামলায় ফাঁসাতে পারে। আমি বাংলাদেশে ফিরবই, সে দেশের মানুষের জন্য ফিরব। দেশকে আবার সঠিক পথে আনার জন্য ফিরব।”

    দু’বছর আগের ‘অভিশপ্ত’ দিনের কথা উল্লেখ করে হাসিনা বলেন, “সেদিন কোনও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়নি। মিথ্যে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। গত দু’বছর ধরে বাংলাদেশকে ভুগতে দেখেছি। সে দেশে ভয়ের পরিবেশ গ্রাস করে ফেলেছে। ১৯৭১ সালে যে ৩০ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন, এটা সেই বাংলাদেশ নয়। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল না। শুরুতে আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের দাবিকে হিংসাত্মক আন্দোলনের রূপ দেয়। আমরা কোটা ব্যবস্থা বাতিল করি ও আলোচনার উদ্যোগ নিই, ৩ জন মন্ত্রী আলোচনাতেও বসেন। কিন্তু তারা আমার পদত্যাগের দাবি তোলেন, মিথ্যা অপপ্রচার চালান।”

    গণহত্যা-সহ একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন হাসিনা। তাঁর মাথায় ঝুলছে ফাঁসির সাজা। হাসিনা জানিয়েছেন, আত্মসমর্পণেও রাজি তিনি। শুধু নিজের দেশে ফিরে যেতে চান। যদিও বর্তমান সরকার তাঁকে সেই সুযোগ দিতে নারাজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালতের চিফ প্রোসিকিউটর তথা প্রধান সরকারি আইনজীবী জানিয়ে দিয়েছেন, দেশে পা রাখা মাত্রই হাসিনাকে সোজা জেলে পাঠানো হবে। তাঁকে আর কোনও সুযোগ দেওয়া হবে না। এদিন দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ার আয়োজিত অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে তিনি জানান, “বাংলাদেশে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। বরং ক্ষমতা দখলের উদ্দেশে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পরিকল্পনা হয়েছিল। ১৫ই জুলাইয়ের পর থেকেই এই আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। দেশের সম্পত্তি পুড়ে খাক হয়েছিল সেদিন।”

    শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলেও তাঁকে বাংলাদেশে ফিরে আসা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ফিরে এসেছিলেন। আবারও ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্প করে তিনি বলেন, “তারা আমাকে কারাগারে পাঠাতে পারে, হত্যাও করতে পারে… যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে, কিন্তু আমাকে ফিরতেই হবে।” শেখ হাসিনাক অভিযোগ, “ক্ষমতা থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে, কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো শিল্প উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে, ঋণখেলাপির হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে, দারিদ্র্য বেড়েছে এবং বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে পড়েছে।” তাঁর দাবি, “বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকার প্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সরকারি কাজ চালাচ্ছে। বর্তমানে বহু কারখানায় তালা পড়েছে।  শয়ে শয়ে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হয় দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।”

    শেখ হাসিনা দাবি করেন, “বাংলাদেশে ছাত্র বিক্ষোভ চলাকালীন প্রতিটি মৃত্যুর তদন্তের জন্য তাঁর সরকার ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল, তবে তিনি অভিযোগ করেন যে, ক্ষমতা গ্রহণের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই তদন্ত হতে দেয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, অশান্তির সঙ্গে জড়িতদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মহম্মদ ইউনূসের সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের নেপথ্যে যে প্রকৃত প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল, তা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। হাসিনার প্রশ্ন, “ইউনূস সরকারে যদি ভয় না-ই পায়, তবে কেন সত্যকে সামনে আসতে দেওয়া হল না?”

    কেবল হাসিনা নন, তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও এদিন ভারচুয়ালি উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরি নওফেল, প্রাক্তন অধিনায়ক শাকিব-আল-হাসানের মতো একাধিক ব্যক্তিত্বরাও ছিলেন। এদিন অনুষ্ঠানে হাসিনাপুত্র বলেন,  “বাংলাদেশ আরেকটা পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে আওয়ামি কর্মীদের খুন করা হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম আক্রান্ত, দুবৃত্তের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। পাক ঘনিষ্ঠ মৌলবাদীদের বাড়বাড়ন্ত, হিজবুত তাহরিরের মতো সংগঠন সক্রিয় সে দেশে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তর গণমাধ্যম, তাই আমার আবেদন এই সমস্ত কথা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যেন তুলে ধরে। তাহলে আন্তর্জাতিক আঙিনায় বিষয়গুলি প্রকাশ্যে আসবে। বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে না আনলে ভারতেরও ভবিষ্যৎ বিপন্ন।” 

    বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, হাসিনার এদিনের বার্তা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিককালে তিস্তা জলচুক্তি, পুশইন, বাংলাদেশ চিনা সক্রিয়তা নিয়ে নয়া দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে শৈত্য জমেছে। ক্ষমতায় এসে প্রথা ভেঙে আগে চিন সফর করেছেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিচ্ছে তাঁর সরকার। লালমণির হাট থেকে শুরু করে মুংলা বন্দরে চিনা সক্রিয়তা বাড়ছে। সব মিলিয়ে বিষয়টিকে যে ভালভাবে দেখছে না দিল্লি, তা আঁচ করা মুশকিল নয়। এই প্রেক্ষাপটে হাসিনার মাধ্যমে ঘুরিয়ে তারেক রহমানকেই বার্তা দেওয়া হল বলে মনে করা হচ্ছে।

    যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইমনকল্যাণ লাহিড়ী এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমার মনে হয় ভারত সরকারের সঙ্গে নিশ্চয়ই একটি ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ, হাসিনা এবং ভারতের পক্ষ থেকে আলোচনাটি হয়েছে। এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য শেখ হাসিনা এই বক্তব্য রেখেছেন। মুজিবকন্যা হিসেবে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং মুজিবরের জন্যই আজকের এই বাংলাদেশ। যে আন্দোলন দেখেছিলাম, তা হাসিনার থেকেও বেশি ছিল ভারত বিরোধী আন্দোলন। আমার মনে হয় ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্র ফেরানোই একমাত্র লক্ষ্য।” তিনি আরও বলেন, “যে পরিস্থিতিতে হাসিনা ভারতে এসেছিলেন, তাতে তাঁর প্রাণ রক্ষা হয়েছে। এটা মাথায় রাখতে হবে তিনি বিদেশি নাগরিক। ভারতের বিদেশমন্ত্রকের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনও বক্তব্যই রাখতে পারেন না। মতামত নিজস্ব হতে পারে, বক্তব্যের প্রক্রিয়া ভারত সরকারে অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ বিদেশমন্ত্রকের ছাড়পত্র রয়েছে, তা মনে করা যায়। তারেক রহমান ভারত বিরোধী কোনও কাজ করেননি, তবে পরিস্থিতি সামাল না দিলে মৌলবাদীদের হাতে দেশটি চলে যাবে। ফলে হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামি লিগের নির্বাচনে লড়া অত্যন্ত জরুরি।” 
  • Link to this news (প্রতিদিন)