এই সময়: ‘স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে ওমন একটু–আধটু হয়েই থাকে, মানিয়ে নে’, ‘শ্বশুরবাড়িতে একটু মানিয়ে নে, বিয়ে ভেঙে গেলে লোকে কী বলবে!’— ভারতীয় সমাজে বিবাহিত মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে মারধর খেলে, পণের দাবিতে নিগৃহীত হলেও অধিকাংশ সময়ে বাপের বাড়ি থেকে এই পরামর্শই জোটে! মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ভয়, লোকলজ্জা— এই সব কারণে অধিকাংশ সময়ে মেয়ের কষ্ট– অভিযোগগুলোকে গুরুত্বই দেন না বাবা–মা। আর সেটাই অধিকাংশ সময়ে ডেকে আনে মর্মান্তিক পরিণতি। কখনও অত্যাচারিত মেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকের হাতে খুন হয়ে যান, আবার কখনও বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। বাপের বাড়ির এই ‘মানিয়ে নে’ বলার প্রবণতাই যে অনেক মেয়েকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, সেটাই প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিল এলাহাবাদ হাইকোর্টের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য।
আদালত বুঝিয়ে দিল, বিবাহিত মেয়ে যদি গার্হস্থ্য হিংসার কথা বলে, তবে বাবা–মা বা বাপের বাড়ির পরিজনের উচিত সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা— তা হলেই অনেক অপূরণীয় ক্ষতি রুখে দেওয়া সম্ভব। ২০১১–এর ১১ জুন উত্তরপ্রদেশের শ্রাবস্তীতে বছর পঁচিশের বিবাহিত তরুণী মীনা দেবী এবং তাঁর ১৫ মাসের শিশুকন্যার গলা কাটা দেহ উদ্ধার হয় শ্বশুরবাড়িতে। নিহতের বাপের বাড়ি জানায়, বিয়ের সময়ে তারা ২.২৬ লক্ষ টাকা পণ দিয়েছিল, তার পরও মেয়ের শ্বশুরবাড়ি মোটরসাইকেল এবং আরও নগদ এক লক্ষ টাকা পণের দাবিতে অত্যাচার চালাতে থাকে। মা ও ভাইয়ের দাবি, শ্বশুরবাড়িতে মারধর, হুমকির কথা প্রায়ই বলতেন মীনা। এমনকী খুন হওয়ার দিন দশেক আগে তরুণী তাঁর বাপের বাড়িতে জানিয়েছিলেন, তাঁকে এবং তাঁর মেয়েকে খুনের হুমকি দিচ্ছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। কিন্তু মীনাকে বাঁচাতে কোনও পদক্ষেপ করেনি বাপের বাড়ি। মেয়ের দেহ উদ্ধারের পরে দায়ের হয় অভিযোগ। এই ঘটনায় ২০১৬ সালে মীনার স্বামী, দুই দেওর, শ্বাশুড়ি এবং শ্বশুরকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪–বি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে দায়রা আদালত। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল মীনার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা।
এই প্রসঙ্গে বিচারপতি রাজেশ সিং চৌহান এবং বিচারপতি অবধেশ কুমার চৌধরির বেঞ্চের বক্তব্য, ‘মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে হেনস্থার শিকার হলে প্রায়ই বিয়ে বাঁচানোর জন্য তাঁদের মানিয়ে নিতে বলা হয়। মেয়েরা তাঁদের উপরে হওয়া অত্যাচারের কথা বললেও বাপের বাড়ি গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু আদালত মনে করে, এই মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ আদতে অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং নির্যাতিতার উপরে অত্যাচার, হেনস্থা বাড়তেই থাকে। তারই চরম পরিণতি ডেকে আনে মৃত্যু।’
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মে মাসেই ভোপালে শ্বশুরবাড়িতে উদ্ধার হয়েছিল ত্বিশা শর্মা নামে এক তরুণীর ঝুলন্ত দেহ। রহস্যমৃত্যুর কেস দায়ের হওয়ার পরে তদন্তে উঠে এসেছিল, পণের দাবিতে ত্বিশার উপরে চাপ সৃষ্টি করত প্রভাবশালী শ্বশুরবাড়ি, সেই সঙ্গে নানা ভাবে ত্বিশাকে অপদস্থ করতেন তাঁর স্বামী। বিষয়টি বার বার বাবা–মাকে জানালেও তাঁরা ত্বিশাকে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন! ত্বিশার সঙ্গে তাঁর বাবা–মায়ের সেই চ্যাটের স্ক্রিনশটও ভাইরাল হয়েছিল। এই ঘটনার কিছুদিন আগে গ্রেটার নয়ডায় নিক্কি ভাটি নামে এক তরুণীকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছিল শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে (অন্য একটি সূত্রের দাবি, নিক্কি নিজেই গায়ে আগুন দেন)। সেক্ষেত্রেও উঠে এসেছিল পণের দাবিতে অত্যাচারের প্রসঙ্গ।
পর পর এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতিদের বক্তব্য, ‘কেসটা (মীনা ও তাঁর কন্যাসন্তানের মৃত্যু) আমাদের এই শিক্ষাই দেয়— মেয়েরা যদি শ্বশুরবাড়িতে হেনস্থা, অপমানের কথা বাপের বাড়িতে বলে, সাহায্য চায়, তবে তাদের কথা সহমর্মিতার সঙ্গে শুনুন। সেগুলোকে গুরুত্ব দিন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করুন। মেয়েদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।’ পণের অত্যাচারে মৃত্যু এবং গার্হস্থ্য হিংসার পর্যাপ্ত প্রমাণ মিলেছে, এই মর্মে দায়রা আদালতের ঘোষিত সাজাও বহাল রেখেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
প্রসঙ্গত, এই রাজ্যের বারাসতেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। বারাসতের নীলগঞ্জের মেয়ে রত্নোত্তমা দে নিজে ছিলেন চিকিৎসক। প্রেম করে বিয়ের পর চিকিৎসক স্বামীর কলকাতায় ফ্ল্যাট, গাড়ির দাবি মানতে চাননি তিনি। উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন রত্নোত্তমা। কিন্তু কিছুদিন পরে তাঁকে বুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে যান স্বামী, কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের চিকিৎসক অরিন্দম বালা। ২০২৩ সালের ২০ অগস্ট স্ত্রীকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে, পরে অস্ত্রোপচারের ছুরি, কাঁচি দিয়েই শিরা কেটে খুনের অভিযোগ ওঠে অরিন্দমের বিরুদ্ধে। খুনের পরেও স্ত্রীর দেহের পাশে রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে অরিন্দম থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। দিন কয়েক আগে বারাসত আদালতও অভিযুক্ত চিকিৎসককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশই দিয়েছে।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট অবশ্য বলছে, ‘বাপের বাড়ি সময়মতো পদক্ষেপ করলে এ ধরনের অনেক অপূরণীয় ক্ষতি রোখা সম্ভব। মেয়ের মৃত্যুর পরে আক্ষেপ করে বা মামলা করে জীবন তো ফিরিয়ে আনা যায় না! তাই পরিবার, আত্মীয় ও সমাজকে বুঝতে হবে, গার্হস্থ্য হিংসার কোনও অভিযোগই হালকা ভাবে নেওয়ার নয়। দেরি হয়ে যাওয়ার আগে পদক্ষেপ করুন।’
তবে সমাজ–লোকলজ্জার ভয়ে বা বাবা–মায়ের দুশ্চিন্তার কথা ভেবে অনেক মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে নিগ্রহ, অত্যাচারের কথা বাপের বাড়িতে জানান–ই না। আবার সন্তানের মুখ চেয়ে অনেকে ‘অসুস্থ’ দাম্পত্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। সমাজের এই ‘গভীর অসুখ’ নির্মূলের দাওয়াই কি? প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।