• বর্ণে-গন্ধে জিভে জল, ফুড স্টলে স্বাস্থ্যবিধি শিকেয়, খাবারের গুণে কবে বদলাবে দিঘার ছবি?
    এই সময় | ০৬ আগস্ট ২০২৬
  • রঞ্জন মাইতি

    সমুদ্রের জোলো হাওয়ায় সিক্ত শরীর ও মন। ঢেউ গুনতে গুনতে অনুভব করলেন পেটে ইঁদুর ডন মারছে। সঙ্গিনীর হাত ধরে বালুকাবেলায় হাঁটতে হাঁটতে চোখ আটকে যায় সৈকতের ধারের স্টলগুলিতে। লাল-লাল, ঝাল-ঝাল পমফ্রেট, তোপসে বা কাঁকড়া ভাজা দেখে মৎস্যপ্রিয় বাঙালির জিভে জল আটকানোর বাঁধ নির্মাণ অসাধ্য। আঙুল চেটে নিমেষে উদরস্থ হয়ে যায় সেই সব সুস্বাদু খানাপিনা। ঘড়ি ধরে জিম, স্মার্ট ওয়াচ দেখে বার বার ফুটস্টেপ মাপার রোজনামচা তখন চুলোয় যাক। উইকেন্ড-এ এইটুকু ‘চিট’ তো করাই যায়। কিন্তু দিঘার সমুদ্রের ধারের স্টল হোক বা মহিষাদলের ঘুগনি গলি— পচা বা ভেজাল খাবারের রমরমা বড় ক্ষতি করে দিচ্ছে না তো?

    পর্যটকদের স্বার্থেই সম্প্রতি ফুড সেফটি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ। সপ্তাহখানেক আগেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সফরে গিয়েছিলেন। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিচ্ছন্নতা, সঠিক পরিষেবায় নজর দেওয়ার পাশাপাশি পর্যটনস্থানগুলিতেও ‘স্ট্রিট ফুড’-এর গুণমান বজায় রাখার বিষয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

    পূর্ব মেদিনীপুর জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের ফুড সেফটি অফিসাররা গত কয়েকদিন ধরে জেলা জুড়ে অভিযান চালাচ্ছেন। বাদ যায়নি মহিষাদলের ঘুগনি গলি থেকে দিঘার সমুদ্রের স্টল। যদি খাবারের গুণগত মান খারাপ হয়, বা ভেজাল কিছু মেশানো হয় তা হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দোকানে দোকানে গিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকরা। দিঘায় দিনে দিনে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে স্টল। যাতে কোনও ভাবেই পচা, ভেজাল খাবার রং মিশিয়ে দেওয়া না হয়, তার জন্য ফুড সেফটি অফিসারদের বিশেষ নজদারি বাড়ানো হয়েছে। খাবার তৈরি, পরিবেশনের পরিবেশ, খাদ্যে রং প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, মাছ-সহ অন্যান্য খাওয়ার সংরক্ষণের জন্য ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে নজরদারি করা হচ্ছে। একই তেল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী প্রতিনিধিদল।

    নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অসীতকুমার দেওয়ানের কথায়, ‘সরকারি নিয়ম মেনেই অভিযান চলছে। যারা সরকারি নিয়ম মেনে খাবার জিনিস বিক্রি করছেন না তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। তার পরেও যদি তা মান্যতা না দেওয়া হয়, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনেকেই লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করছেন। তাদের হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

    বিভিন্ন সময়ে খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে নানা অভিযোগ জমা হয় দপ্তরে। সেই অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে নজরদারি চলে ফুড স্টল থেকে রেস্তোরাঁয়। কারণ অস্বাস্থ্যকর খাওয়ার খেয়ে যাতে কেউ অসুস্থ হয়ে না পড়েন তার জন্য বিশেষ নজরদারি। সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে যে কে সেই। তবে স্থানীয়দের দাবি, ছ’মাস বা এক বছর অন্তর অভিযান চালালে হবে না। একমাস অন্তর নজরদারি চালাতে হবে। যারা সরকারি নিয়ম অমান্য করবে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করার কথা তুলে ধরছেন সাধারণ মানুষ।

    ১) অভিযানের সময় খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার জন্য বেশ কিছু খাবার ফুড সেফটি অফিসারেরা নিয়ে যান। কিন্তু সেই রিপোর্ট হাতে পেতে বহু সময় লেগে যায়। নিয়ম রয়েছে, খাদ্যের গুণগত মানের পরীক্ষার রিপোর্ট ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়ার। কিন্তু আমাদের রাজ্যে মাত্র তিনটি ল্যাবরেটরি থাকায় রিপোর্ট আসতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়।

    ২) পাশাপাশি ফুড সেফটি অফিসে লোকের অভাব একটা বড় সমস্যা। ফুড সেফটি অফিসার শ্রাবণী সাহা বলেন, ‘পূর্ব মেদিনীপুর জেলা বৃহৎ এলাকা জুড়ে। সেই জেলায় কয়েক লক্ষ খাবারের দোকান রয়েছে। খাবার পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য জেলায় মাত্র ৬ জন ফুড সেফটি অফিসার রয়েছেন। যার মধ্যে একজন অসুস্থ থাকায় ছুটিতে রয়েছেন। ৫ জন মিলে ২৫ ব্লকের হাজার হাজার দোকান ভিজিট করা সম্ভব নয়। তাই এলাকা ভিত্তিক অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জরিমানা, শো কজ় করা আমাদের লক্ষ্য নয়। সকলের মধ্যে সচেতনতা বড়ানোই আমাদের মূল লক্ষ্য। তাই আমরা স্কুল কলেজের পড়ুয়াদের নিয়ে সচেতনার বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করে চলেছি।’

    ৩) সরকারি তদারকির পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের সচেতনতাও জরুরি। একজন ক্রেতা কিছু খেতে এলে নোংরা বা অস্বাস্থ্যকর খাওয়ার দেখলে তার প্রতিবাদ করা দরকার। ফুড সেফটি আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, অভিযান চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর কিছু দেখলে আগে দোকানের মালিককে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়। তিনি যদি নিজেকে পরিবর্তন না করে থাকেন, তা হলে তাঁকে নোটিস দেওয়া হয়। সেই নোটিসের যথোপযুক্ত উত্তর না দিতে পারলে এবং অফিসারদের উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ থাকলে লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা করা হয়।

    কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিজের মুনাফার কথা ভেবে সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যবসা করে থাকেন। তাদের জন্য বাকি ব্যবসায়ীদের সরকারি কোপের মুখে পড়তে হয়। ব্যবসায়ী কার্তিক দাস বলেন, ‘আমরা সরকারি নিয়ম মেনেই খাবার বিক্রি করি। তবে কিছু কিছু ব্যবসায়ী ভুল করার জন্যেই সমস্যা হয়।’ ক্ষোভ রয়েছে ক্রেতাদের মধ্যেও। বুদ্ধদেব মান্না বলেন, ‘কম পয়সার খাওয়ার হিসাবে আমাদের আগে মনে পড়ে চপ ও ঘুগনি-মুড়ির কথা। মহিষাদল ঘুগনি গলিতে ভিড়ও জমে। কিন্তু খাবারের গুণগত মান খুবই খারাপ। সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নজদারি ও কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।’

    হ্যাঁ। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের ফুড সেফটি আধিকারিকরা দিঘা-সহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় খাবারের দোকান ও স্ট্রিট ফুড স্টলে অভিযান চালাচ্ছেন।

    খাবারের গুণমান, রান্না ও পরিবেশনের পরিবেশ, কৃত্রিম রংয়ের ব্যবহার, মাছ সংরক্ষণে ফরমালিনের ব্যবহার, একই তেল বারবার ব্যবহার এবং খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    প্রথমে সতর্ক বা নোটিস দেওয়া হতে পারে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে জরিমানা এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

    না। দিঘার পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের অন্যান্য এলাকা এবং মহিষাদলের ঘুগনি গলির মতো জনপ্রিয় খাবারের জায়গাতেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

    দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ব মেদিনীপুরের মতো বিস্তীর্ণ জেলায় খাবারের দোকানের তুলনায় ফুড সেফটি অফিসারের সংখ্যা কম। ফলে সব দোকানে নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

  • Link to this news (এই সময়)