• জ্বলছে বাবার চিতা, ভিন রাজ্য থেকে ভিডিয়ো কলে শেষকৃত্য দেখতে দেখতে মেয়ের প্রশ্ন— ‘আর কত সময় লাগবে?’
    এই সময় | ০৬ আগস্ট ২০২৬
  • তিন মেয়েকে মানুষ করতে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু সেই বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়েও শেষযাত্রায় আসার সময়টুকুও পেলেন না কোনও সন্তানই। বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েও শেষ জীবনে সেবাযত্ন পেতে ঠিকানা হয়েছিল বৃদ্ধাশ্রম। মৃত্যুর পরেও শেষকৃত্যের দায়ভারও বৃদ্ধাশ্রম কর্মীদের উপরেই তুলে দিলেন বৃদ্ধের তিন সন্তান। বরং ভিডিয়ো কলে বাবার শেষকৃত্য দেখেন তাঁরা। হরিয়ানার সোনিপতের নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের এই পরিণতি চোখ ভিজিয়ে দিল অনেকেরই।

    জানা গিয়েছে, হরিয়ানা সোনিপতের বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা বৃদ্ধের নাম শিবচরণ রামরতন গুপ্ত। একসময়ে তিনি মুম্বইয়ের সফল বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সম্পত্তিও বিপুল। তিন মেয়ের বিয়ের পরে স্ত্রী মীনাই ছিলেন তাঁর সম্বল। শেষ বয়সে একটু সেবা ও যত্নের ছোঁয়া পেতে প্রায় দু’বছর আগে স্ত্রী মীনা গুপ্তকে নিয়ে সোনিপতের একটি বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসেন। কিছুদিনের মধ্যেই স্ত্রীয়ের মৃত্যু হয়। এর পরে একাই বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন তিনি। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টা নাগাদ দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়।

    মাসখানেক ধরে অসুস্থ ছিলেন বৃদ্ধ শিবচরণ। বৃদ্ধাশ্রমের প্রশাসক আনন্দ কুমার জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগে শিবচরণ বারবার তাঁর তিন মেয়েকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পরে গত প্রায় ২০ দিন ধরে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ বারবার তাঁর মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাবার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা কেউই সোনিপতে আসেননি। আনন্দ কুমারের কথায়, ‘অসুস্থ হওয়ার পরে তাঁর মেয়েদের ফোন আসাও কমে গিয়েছিল। আমরা বারবার অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তাঁরা আসতে পারেননি।’

    মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টা নাগাদ শিবচরণ গুপ্তের মৃত্যু হয়। এর পরে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁর তিন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু মেয়েরা জানান, সোনিপতে এসে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁদের মধ্যে একজন অনলাইনে ৫,১০০ টাকা পাঠিয়ে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকে বাবার শেষকৃত্য করার অনুরোধ করেন। এর পরে বৃদ্ধাশ্রমের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

    বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের দাবি, শিবচরণ গুপ্ত সারাজীবন তিন মেয়ের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতেই নিজের উপার্জনের টাকা খরচ করেছিলেন। তাঁর দুই মেয়ে বর্তমানে শিক্ষকতা করেন। তিনি প্রায়ই তাঁদের সাফল্যের কথা গর্ব করে বলতেন। তবে শেষের দিকে মেয়েদের থেকে অবহেলা পেয়েই শেষ জীবনটা যত্নে কাটাতে বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসেন। তবু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে পর্যন্ত তিন সন্তানকে না দেখতে পাওয়ার আফসোস আর কষ্ট তাঁর চোখে স্পষ্ট ছিল বলে দাবি।

    স্থানীয় সূত্রে খবর, বৃদ্ধের তিন মেয়ে—একজন নেপালে, একজন উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে এবং তৃতীয়জন মুম্বইয়ে ছিলেন। তাঁরা ভিডিয়ো কলেই বাবাকে শেষবারের মতো দেখেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের সেই ভিডিয়ো কলের একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। তাতে শোনা যায়, ভিডিয়ো কলে থাকা এক মেয়ে প্রশ্ন করছেন, ‘আর কতক্ষণ লাগবে? আমাদের খাওয়া-দাওয়া আর স্নান করতে হবে।’

    ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এটিকে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন। কারও মতে, বর্তমান প্রজন্ম প্রবীণদের যত্ন নেয় না, অবহেলা করে। আবার কেউ কেউ মনে করিয়ে দিয়েছেন, ঘটনাটির সম্পূর্ণ পারিবারিক প্রেক্ষাপট প্রকাশ্যে না আসায় একতরফা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। তবে বৃদ্ধদের একাকিত্ব এবং পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

    হরিয়ানার সোনিপতের একটি বৃদ্ধাশ্রমে এই ঘটনাটি ঘটেছে।

    বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, মৃত বৃদ্ধের নাম শিবচরণ রামরতন গুপ্ত।

    অভিযোগ, তিন মেয়ে শেষকৃত্যে উপস্থিত না থেকে ভিডিয়ো কলে বাবার শেষকৃত্য দেখেন। সেই সময়ের একটি ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।

    বৃদ্ধাশ্রমের কর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পরিবারের এক সদস্য অনলাইনে অর্থ পাঠিয়েছিলেন বলে দাবি।

    ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে এক মহিলা বলতে শোনা যায়, ‘আর কতক্ষণ লাগবে? আমাদের খাওয়া-দাওয়া আর স্নান করতে হবে।’ তবে ভিডিয়োটির প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

    ঘটনার পর প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক দায়িত্ব, বৃদ্ধাশ্রমে একাকিত্ব এবং সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অনেকেই মনে করিয়ে দিয়েছেন, সম্পূর্ণ পারিবারিক প্রেক্ষাপট প্রকাশ্যে না আসায় একতরফা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

  • Link to this news (এই সময়)