Exclusive: পাথর খাদান থেকে দৈনিক লুট ৯ কোটি টাকা, টুলু-কাণ্ডে মমতা-যোগ নিয়ে বিস্ফোরক মন্ত্রী দুধকুমার
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৭ আগস্ট ২০২৬
বীরভূমের পাথর খাদান ঘিরে যে বিপুল দুর্নীতির জাল ফেঁদেছিল তৃণমূল, সে সম্পর্কে বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা ময়ূরেশ্বরের বিধায়ক দুধকুমার মণ্ডল। তাঁর দাবি, মহম্মদ নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডল রোজ পাথার খাদান থেকে ৯ কোটি টাকা লুট করতেন। উল্লেখ্য, এই টুলু মণ্ডল জেলায় পরিচিত ছিলেন ‘পাথরসম্রাট’ নামে। একাধিক জেলায় রাস্তা তৈরির বরাতও পেত তাঁর সংস্থা। সম্প্রতি তাঁর কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি উদ্ধার হওয়ার পরই গোটা রাজ্যে হইচই পড়ে গিয়েছে।
দুধকুমারের দাবি, টুলু মণ্ডলের মাথার উপর সরাসরি হাত ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। শাসকদলের ছত্রছায়ায় থেকেই এত বছর ধরে চলেছে এই ভয়ঙ্কর তোলাবাজি। একসময় ট্রাকে পাথর বোঝাই করার দিনমজুর ছিলেন টুলু। সেখান থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেআইনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক বছরেই গড়ে তোলেন প্রায় ২২০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য। মন্ত্রীর সাফ কথা, স্বাভাবিক বা বৈধ উপায়ে এত সম্পদ গড়া কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না।
মন্ত্রীর অভিযোগ, খাদান থেকে পাথর চুরি করেই বিপুল কালো টাকা রোজগার করত টুলু। রোজ ১০ থেকে ১২টি ওভারলোডেড গাড়ি ভুয়ো ডিসিআর দেখিয়ে খাদান থেকে বেরিয়ে যেত। এর মধ্যে পূর্বতন সরকারের খাতায় জমা পড়ত মাত্র ৩০ লক্ষ টাকা। বাকি ৯ কোটি টাকা রোজ ঢুকত টুলুর নিজের পকেটে। বছরের পর বছর এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়েই কয়েকশো কোটি টাকার সম্পত্তি বানিয়ে ফেলে এই তথাকথিত পাথরসম্রাট। দুধকুমারের কথায়, শুধু পাথরের পয়সা নয়, এর মধ্যে মিশে রয়েছে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকাও। মহম্মদবাজার থেকে মুরারই, নলহাটি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার ব্যাসল্ট পাথরের (basalt stone) খনি থেকে যে কালো স্টোনচিপ রাজ্যের বাইরে এবং বাংলাদেশে সরবরাহ হতো, তার সিংহভাগই ছিল টুলুর নিয়ন্ত্রণে। খাদান থেকে ক্রাশারে যাওয়া পাথর ডিসিআর গেট আর মোটর ভেহিকেল চেকপোস্ট পেরিয়ে বেরিয়ে যেত অনায়াসে। টোল প্লাজাতেও বসানো ছিল টুলুর নিজস্ব লোক, যার ফলে সরকারের ঘরে কার্যত কোনও রাজস্বই ঢুকত না।
দুধকুমারের দাবি, বীরভূমের প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। কেষ্টর রাজনৈতিক ছত্রছায়াতেই কোনও ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া বেআইনিভাবে চলত পার্কিং লট আর টোল ট্যাক্স আদায়ের কারবার। মন্ত্রীর বক্তব্য, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বীরভূমে সীমাহীনভাবে চলেছে লুটতরাজ, তোলাবাজি আর কাটমানির কারবার।
শুধু পাথরই নয়, রাজ্যের নানাবিধ খনিজ সম্পদ ঘিরে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে বারবার। পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর সাম্প্রতিক দাবি অনুযায়ী, রাজ্যে পালাবদলের পর ছবিটা অনেকটাই বদলেছে। তাঁর কথায়, পুরুলিয়া ও আসানসোলের কয়লা অঞ্চল থেকে এখন প্রতি মাসে ৬৫০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হচ্ছে। জিরো টলারেন্স নীতিতে বেআইনি বালি পাচার থেকে খাদ্য দফতরের দুর্নীতি পর্যন্ত একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে বলেও দাবি তাঁর। বীরভূমের পাথর খাদান নিয়ে দুধকুমারের অভিযোগের সঙ্গে এই পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট, রাজ্যের খনিজ সম্পদ ঘিরে রাজস্ব আদায় বরাবরই থেকেছে রাজনৈতিক তরজার কেন্দ্রে।
টুলু মণ্ডলের সম্পত্তির উৎস, সিন্ডিকেট চক্র এবং তার রাজনৈতিক যোগ নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। আগামী দিনে এই মামলায় আরও কী কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের। তবে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা, কেঁচো খুঁড়তে যে কেউটে বেরিয়ে পড়তে পারে, সেই সম্ভাবনাই ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।