• কর বাড়লে ক্ষতি নেই, পরিষেবাটা ভালো হোক, চাইছেন গ্রামবাসীরা
    এই সময় | ০৭ আগস্ট ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী, মহম্মদ মহসিন

    বিতর্কটা উস্কে দিয়েছেন খোদ রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। পঞ্চায়েতের রোজগার বাড়াতে গ্রামীণ এলাকায় বাড়িপিছু কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা নিয়ে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত পিছু হটেছে সরকার। যদিও পঞ্চায়েত মন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাচ্ছেন অনেকেই। তাঁদের বক্তব্য, গ্রামের হাল বদলাতে গেলে অর্থের প্রয়োজন। কর আদায় বাড়াতে না পারলে পঞ্চায়েত টাকা পাবে কোথায়?

    আয় না বাড়লে উন্নয়নের টাকা জোগাড় করতে পঞ্চায়েতকে চিরকাল রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী থাকতে হবে। তার জন্যই কর বাড়ানোর প্রস্তাবকে সমর্থনই জানাচ্ছেন তাঁরা। তবে অনেকেই জানাচ্ছেন, তাঁরা বাড়তি ট্যাক্স গুণতে রাজি আছেন, কিন্তু তার সঙ্গে গ্রামে পরিষেবাটাও আরও উন্নত করা দরকার। তাঁরা চান, পুরসভার মতো পঞ্চায়েত এলাকাতেও নিয়মিত জঞ্জাল সাফাইয়ের ব্যবস্থা করা হোক। রাতের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাস্তায় আলো লাগানো হোক। সেই সঙ্গে গ্রামে পরিদ্রুত পানীয় জলের জোগান এবং নিকাশি ব্যবস্থার আরও মানোন্নয়ন ঘটানো হোক।

    সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, পঞ্চায়েত এলাকায় মূলত গৃহকর, জমিকর আদায় করা হয়। এছাড়াও দোকানদের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায় করে পঞ্চায়েত। কিছু পঞ্চায়েত এলাকায় আবার জঞ্জাল সাফাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট হারে ফি আদায় করা হয়। এছাড়াও পুকুর, খাল, জায়গা, দোকানঘর লিজ দিয়ে থাকে পঞ্চায়েতগুলি। তা থেকেও বেশ কিছু টাকা রোজগার হয়। কিন্তু পঞ্চায়েতগুলি সারা বছরে যে টাকা রোজগার করে, তার থেকে অনেক বেশি টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ হয়। ফলে যে কোনও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তাদেরকে নির্ভর করতে হয় রাজ্য অথবা কেন্দ্র সরকারের উপরে। সরকারি অনুদান না পেলে পঞ্চায়েতে কোনও কাজই হয় না। রাস্তা বানানো থেকে খাল ও পুকুর সংস্কার, ড্রেন বানানো, শ্মশানের সংস্কার ইত্যাদি কাজের জন্য একেকটা পঞ্চায়েত এলাকায় বছরে বেশ কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়। তার সিংহভাগটাই আসে সরকারি অনুদান থেকে।

    পঞ্চায়েত দপ্তরের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, পঞ্চায়েতগুলিকে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য বিভিন্ন উপায়ে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। বিশ্বব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে পঞ্চায়েতগুলিকে যে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়, তারও অন্যতম শর্ত হলো আয় বৃদ্ধির বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করা। কিন্তু নানা কারণে সেই কাজ এখনও থমকে রয়েছে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী সম্ভবত সেই রাস্তাটাই খুলতে চেয়েছিলেন।

    বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ও উপপ্রধানরা জানাচ্ছেন, বিগত কোনও সরকারই ট্যাক্স বাড়ানোর কোনও ভাবনা-চিন্তাই করেনি। উল্টে বেশ কিছু ট্যাক্স মকুব করে দেওয়া হয়েছে। পুর এলাকায় কেউ ট্যাক্স না দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু গ্রামের লোকেরা ট্যাক্স না দিয়েও দিব্যি পার পেয়ে যান। ফলে বছরের পর বছর ধরে ট্যাক্স অনাদায়ী থেকে যায়। ট্যাক্স আদায় বাড়াতে অনলাইন সিস্টেম চালু হলেও তাতে আদতে কোনও লাভই হয়নি। ট্যাক্স দেওয়ার ব্যাপারে আগের মতোই কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না গ্রামের করদাতারা। ফলে পঞ্চায়েতকে স্বাবলম্বী করার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল, সেটা অধরাই থেকে গিয়েছে।

    হুগলির মগরা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান রঘুনাথ ভৌমিক বলেন, 'একটা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বছরে ২০-২৫ লক্ষ টাকা কর আদায় হয়। সেই টাকা লাইট মেরামত ও বিদ্যুতের বিল মেটাতেই ফুরিয়ে যায়। ইচ্ছে থাকলেও, সারা রাত রাস্তার আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারি না।' তাঁর ব্যাখ্যা, 'এখন গ্রামের চরিত্র অনেক বদলেছে। লোকসংখ্যাও বাড়ছে। গ্রামে আগের মতো জঞ্জাল ফেলার জন্য কোনও খোলা জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পঞ্চায়েতকেই জঞ্জাল সরাতে হচ্ছে। কিন্তু পরিকাঠামো ততটা উন্নত না হওয়ায় এই কাজে সমস্যা হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ এলাকাতেও ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। নিজস্ব রোজগার না বাড়াতে না পারলে এই সব সমস্যা কোনও দিন মিটবে না।'

    আমতার বাসিন্দা তথা হাওড়ার অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ফটিক চক্রবর্তী বলেন, 'বর্তমানে পঞ্চায়েতের আইন ও বিধি অনুযায়ী গৃহভিত্তিক করের পরিমাণ ঠিক করা হয়। প্রত্যেকেরই সেই টাকাটা মিটিয়ে দেওয়া উচিত। তা না হলে এলাকার উন্নয়ন হবে না। একই সঙ্গে বলব, গ্রামের মানুষ যাতে ঠিকঠাক পরিষেবা পান, সেটাও সুনিশ্চিত করতে হবে পঞ্চায়েতকে।'

    শ্যামপুরের রাধানগরের বাসিন্দা পেশায় গ্রামীণ চিকিৎসক অমল মেটিয়া বলেন, সচেতন নাগরিক হিসাবে সময়ে কর দেওয়াটা যেমন আমাদের কর্তব্য, তেমনি পরিষেবার মান উন্নত হওয়া দরকার। বিশেষ করে জঞ্জাল সাফাই পরিষেবা যাতে ঠিকঠাক চালু থাকে, সেটা দেখা উচিত প্রশাসনের।' ঝিকিরার বাসিন্দা শামসুল রহমান বলেন, 'কর বাড়লে আপত্তি নেই। তবে গ্রামের রাস্তাঘাটগুলো উন্নত করা দরকার। মানুষ যাতে ঠিকঠাক পানীয় জল পায়, সেটাও তো দেখতে হবে সরকারকে।'

  • Link to this news (এই সময়)