এই সময়: পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পবান্ধব রাজ্য হিসেবে দেশ–বিদেশের শিল্পপতিদের কাছে প্রজেক্ট করাই বিজেপির প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথে যে তৃণমূল জমানা থেকে বাংলায় চলে আসা তোলাবাজি–সংস্কৃতি কাঁটা বিছিয়েছে, সে অভিযোগ বার বার উঠেছে। ফলে তোলাবাজি বন্ধ করতে কার্যত সাঁড়াশি আক্রমণে নেমেছে শমীক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বঙ্গ–বিজেপি এবং শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার।
ইতিমধ্যেই তোলাবাজির অভিযোগে বিজেপির অনেককে শো–কজ় করা হয়েছে। শমীক দলের নেতা–কর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, পার্টির কারও বিরুদ্ধে তোলা আদায় অথবা কাটমানি খাওয়ার অভিযোগ উঠলে তাঁকে কোনও ভাবেই রেয়াত করা হবে না। পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারী আবার কড়া বার্তা দিলেন বাংলার গুন্ডা–মস্তানদের। বৃহস্পতিবার সল্টলেকের মিলন মেলা প্রাঙ্গণে বস্ত্রশিল্প মেলায় যোগ দেন তিনি। ব্যবসায়ীদের ভরসা জোগাতে সেখান থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'শিল্প তৈরির জন্য সবার আগে রাজ্যের আইন–শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ঠিক করতে হবে। গুন্ডাগিরি, সিন্ডিকেটরাজ, কাটমানির যে পরিবেশ বাংলায় ছিল, সেটা সবার আগে পরিবর্তন করতে হবে।' তাঁর সংযোজন, 'বাংলায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরবে। দেখব, ভাবব— এ সব ছেড়ে 'কাজ করব' নীতি চালু হবে। তখনই তো রাজ্য এগোবে।'
বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, পুরোপুরি না হলেও তোলাবাজি এবং গুন্ডা–মস্তানদের দাপাদাপি বিজেপি শাসিত বাংলায় এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যা বাংলায় বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলেই গেরুয়া শিবিরের ব্যাখ্যা। মুখ্যমন্ত্রী এ দিন সেই সূূত্র ধরেই শিল্পপতিদের উদ্দেশে বলেন, 'পরিবেশ বদলের ইঙ্গিত তো আপনারাও পেয়েছেন। এখানে আর কোনও গুন্ডাগিরি হবে না। কথা দিচ্ছি, বস্ত্রশিল্পকে সবরকম ভাবে সহযোগিতা করবে রাজ্য সরকার। প্রয়োজনে বিধানসভায় আইনও বদল করা হবে।' এ প্রসঙ্গেই মিলন মেলার অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী এক মাসের মধ্যে অন্তত ২৫ জন বিনিয়োগকারীকে রাজ্য সরকার শিল্পের জন্য জমি দিতে চলেছে। তাঁর দাবি, 'আগামী দু'এক বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হবে।' বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে শুভেন্দুর বার্তা, 'এটা অমৃতকাল। অমৃতকালের ভরপুর ব্যবহার করুন। বাংলা আর দুর্বল রাজ্য থাকবে না।'
শুধু দল হিসেবে বিজেপি অথবা তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও যে বাংলাকে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তপোক্ত করার উপরে ফোকাস করেছেন, সেটাও এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলার হাল পরিবর্তনের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্যোগী হয়েছেন। শুভেন্দুর দাবি, 'প্রধানমন্ত্রী সব মন্ত্রীকে বলে দিয়েছেন, তোমরা দ্রুত বাংলায় যাও। ওখানে কাজ করো। যে কোনও মূল্যে বাংলাকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে হবে। সেই কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।' তিনি জানান, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন অগস্টের শেষ সপ্তাহে রাজ্যে আসতে পারেন। শুভেন্দুর ক্যাবিনেটের এক হেভিওয়েট মন্ত্রীর কথায়, 'তোলাবাজি, গুন্ডাগিরির বিরুদ্ধে আমাদের সরকার জি়রো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। বাংলায় আইনের শাসন ফিরছে কি না, সে দিকে কড়া নজর রাখছেন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা।' তোলাবাজি বন্ধ করতে শুভেন্দুদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'সংগঠিত লুট ও দুর্নীতির মোকাবিলায় সরকারের যে কোনও সদর্থক পদক্ষেপকেস্বাগত জানাই।'
এ দিকে, তোলাবাজি রুখতে বিজেপি নেতৃত্ব এ দিন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সল্টলেকের রাজ্য দপ্তরে ওই বৈঠকে বঙ্গ–বিজেপির কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ছাড়াও হাজির ছিলেন দলের দুই কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল এবং অমিত মালব্য। এ দিনের বৈঠকে বারাসত এবং উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার বিজেপি নেতাদের ডাকা হয়। সূত্রের খবর, এই এলাকাগুলি থেকেই তোলাবাজির অভিযোগ সবথেকে বেশি। তাই বারাসত এবং উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার নেতাদের ডেকে বনসলরা বলে দিয়েছেন, তোলাবাজি বন্ধ করতে আরও সক্রিয় হতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের।