পরিষদীয় বা সংসদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত নয়। মূল রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। শিবসেনায় ভাঙন এবং দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদের মামলা এ কথাই বলল সুপ্রিম কোর্ট। তবে শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তুলল রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি নিয়েও। আদালতের প্রশ্ন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো কি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র থাকা উচিত নয়?
দলের নাম-প্রতীক-তহবিল কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে তৃণমূলের তিনটি গোষ্ঠীই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই পরিস্থিতিতে শিবসেনার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন একনাথ শিন্ডের শিবিরকে আসল শিবসেনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের হাতে দলের নাম-প্রতীক তুলে দিয়েছিল। এখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলও কমিশনের কাছে ঠিক সেই আর্জিই করেছে। তাই প্রত্যাশিত ভাবে শিবসেনার মামলায় ঋতব্রত শিবির তো বটেই, নজর রাখছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালীঘাট শিবির’-ও। একই সঙ্গে কমিশনের ফয়সালার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়া তৃণমূল সাংসদরাও। কারণ তাঁরা এখনও এনসিপিআই সাংসদ হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।
বৃহস্পতিবার শিবসেনার মামলায় শুনানিতে উদ্ধব ঠাকরের শিবিরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ। উদ্ধবসেনার উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, ‘আপনাদের দলের গঠনতন্ত্র তো গণতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ আপনারা তা সংশোধন করে একজনের হাতে সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে দিলেন। দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো রাজনৈতিক দল হিসেবে আপনাদেরও কি গণতান্ত্রিক নীতি মেনে চলা উচিত নয় নয়?’
সুভাষ দেশাই মামলার উল্লেখ করে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মনে করিয়ে দেন যে, মূল রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। পরিষদীয় গোষ্ঠী বা সংসদীয় গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত নয়। তবে দলত্যাগের মামলা খতিয়ে দেখতে ঘটনাক্রমও নজরে রাখা জরুরি বলে জানান বিচারপতি বাগচী। অর্থাৎ, কোন তারিখে বিদ্রোহী বিধায়কদের বিধায়ক পদ খারিজ চেয়ে স্পিকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল, তা-ও বিবেচনা করা হবে। তার সঙ্গে আবেদনের আগে বা পরের ঘটনাকে একই পাল্লায় বিচার করলে হবে না।
অন্য দিকে, উদ্ধবসেনার হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী কপিল সিবাল বলেন, ‘দলত্যাগ হলো সাংবিধানিক অপরাধ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজকাল এটাকে বীরত্বের সম্মান দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, জনপ্রতিনিধি আইন অনুযায়ী দলের সংবিধান সংশোধন করলে, তা নির্বাচন কমিশনকে স্রেফ জানিয়ে দেওয়াই নিয়ম। কমিশনের আইনত কোনও এক্তিয়ার নেই যে, তারা একটি দলের অভ্যন্তরীণ নিয়মনীতি বৈধ কি না, তা খতিয়ে দেখবে বা বাতিল করার। কিন্তু কমিশন উদ্ধবসেনার সংবিধান (২০১৮ সালে সংশোধিত) উপেক্ষা করেই যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সিবাল আরও অভিযোগ করেন, স্পিকার শিন্ডে শিবিরের বিধায়কদের বরখাস্তের মামলা ইচ্ছা করে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যাতে তাঁরা সরকার গড়ার সুযোগ পান। প্রবীণ আইনজীবীর মন্তব্য, ‘ক্ষমতা হলো চুম্বকের মতো। প্রথমে ৩১ জন বিধায়ক দল ছাড়লেন। আর পরে স্পিকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ না করায় সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জন হলো। এমনকি একনাথ শিন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে অনেক সাংসদও দল বদলে ফেললেন।’
শিন্ডেসেনার পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কিষাণ কল ও মনিন্দর সিং কমিশন ও স্পিকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে গিয়ে জানান, শিন্ডে শিবিরের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন ছিল। নির্বাচন কমিশন সব তথ্য, হলফনামা এবং জনপ্রতিনিধিত্বের সংখ্যা বিচার করেই শিন্ডে শিবিরকে আসল শিবসেনা বলে রায় দিয়ে দলীয় প্রতীক তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল।