• পটেরও পালাবদল! শাড়ি-জামাকাপড় থেকে গয়নাগাটি, সবেতেই পুরাণ কাহিনি জুড়ে দিচ্ছেন শিল্পীরা
    এই সময় | ০৭ আগস্ট ২০২৬
  • সুমন ঘোষ

    কপালে নমাজের কালো দাগ। চিবুকে দাড়ি। একটানা দুলে দুলে গান গেয়ে চলেছেন পটিদার। কখনও গাইছেন, ‘বেহুলা ভাসাল কলার মান্দাস, কোলে তার মৃত স্বামী’। কখনও আবার সুর তুললেন— ‘সীতা সতী চললেন বনবাসে’। এই গানের তালে তালেই হাতে গোটানো পট একটু একটু করে খুলে যায়। চোখের উপর ফুটে ওঠে রঙিন ছবির রামায়ণ, মনসামঙ্গল। হয়তো রোজা রেখেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে হিন্দু দেবদেবীর গান গেয়ে চলেছেন পটিদার। তাতেই জুটে যায় চাল-ডাল-আলু-কাঁচকলা। কখনও-সখনও দু’-এক টাকাও।



    এক সময়ে এ ভাবেই পেট চলত পিংলার নয়াগ্রামের পটুয়া শিল্পীদের। পরে ধীরে ধীরে লুপ্তির পথ ধরে এই পেশা। তবে গত কয়েক বছরে আবার একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পট শিল্প। সৌজন্যে নতুন নতুন ভাবনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এখন শাড়ি, সালোয়ার, টি-শার্টেও সাজিয়ে দেওয়া হয় সনাতনী পটের ছবি। কোথাও হাতপাখায় ফুটে ওটে মাছের ঝাঁক। কোথাও আবার স্বয়ং মহাদেব বসে থাকেন টি-পট জুড়ে। ইদানিং পুজোপ্যান্ডেলেও পটচিত্রের কদর বেড়েছে।

    আসলে ‘পট’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পট্ট’ থেকে। যার অর্থ বস্ত্র। চলতি কথায়, পট হলো কাপড় বা কাগজের উপর বিশেষ কায়দায় আঁকা চিত্র বা চিত্রাবলী। সেই ছবি দিয়েই এতকাল বিবৃত হয়ে এসেছে রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, কৃষ্ণলীলার কথা। লাঠিতে জড়ানো পট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গান, আবৃত্তি বা কথকতার মাধ্যমে পটুয়া পটের কাহিনি শোনাতেন শিল্পীরা।



    লোকসংস্কৃতিবিদদের মতে, বহু আগে পট আঁকা হতো চটের উপর। প্রথমে কাদা ও গোবরের মিশ্রণ দিয়ে চটের যে দিকটায় ছবি আঁকা হবে, সে দিকটা মসৃণ করে নেওয়া হতো। তা শুকিয়ে গেলেই আঁকা হতো ছবি। পরে অবশ্য চটের জায়গা নেয় কাপড় বা তুলোট কাগজ। অষ্টাদশ শতাব্দীর আগের কোনও পটশিল্পের নিদর্শন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি ঠিকই। তবু লোকশিল্পের এই ধারাটি যে বেশ পুরোনো, তা নানা পুথিপত্রের বিবরণ থেকে বেশ বোঝা যায়। বাংলায় সাধারণত দু’ধরনের পট প্রচলিত। চৌকাপট আর বহুপট বা দীর্ঘপট। কালীঘাটের স্বয়ংসম্পূর্ণ একক পটগুলি হলো চৌকাপট। আর জড়ানো পটকে বহুপট বা দীর্ঘপট বলে।

    নয়াগ্রামের এই বহুপট ধীরে ধীরে শিল্পের মর্যাদা পায়। বিদেশি পর্যটকেরা ভিড় জমালেন নয়াগ্রামে। অন্য দিকে, পটচিত্র শিল্পী মণিমালা চিত্রকর, আনোয়ার চিত্রকর, সুমন চিত্রকর, রূপসোনা চিত্রকরেরাও গেলেন বিদেশ বিভুঁইয়ে। কেউ রাশিয়া, আমেরিকা, স্কটল্যান্ডে। কেউ কেউ আবার অস্ট্রেলিয়া, জাপানে। তাঁরা বুঝলেন, পটের কদর রয়েছে। তবে এই শিল্পের বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। বালিশ, বিছানা থেকে শুরু করে পোশাক, গয়না, জুতো, ব্যাগে পটচিত্র তুলে আনতে হবে।

    এই কাজে এক সময়ে এগিয়ে এসেছিল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ। তাদের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নতুন প্রজন্মের পটশিল্পীদের। ফ্যাশন দুনিয়ার খুঁটিনাটি সম্পর্কে তাঁদের বোঝানো হয়। শেখানো হয় কী ভাবে রিসর্টওয়্যার, মেটিং ডান্স ড্রেস, জাঙ্গল ড্রেস, মিয়াও কো-অর্ড ড্রেস, বার্ড হাউস ড্রেস, ডুয়ালিটি কিউবান শার্ট, ফার্স্ট ফ্লাইট কিমোনো, ফ্যামিলি ট্রি কিমোনো, হেভেনস্ টাওয়ার জ্যাকেট, বার্ড হাউস স্কার্ফ, কুশন কভার, ল্যাপটপ কভার, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ থেকে আংটি, গলাবন্ধ— সমস্ত জিনিসেই পটচিত্র ফুটিয়ে তোলা যায়।

    এতে কাজও হয়েছে। বাহাদুর চিত্রকর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই প্রশিক্ষণ কর্মশালা পটচিত্রের জগতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আমরা ধীরে ধীরে সে পথে এগোনোর চেষ্টা করছি।’ সুমন চিত্রকরের কথায়, ‘পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে জুতো, ব্যাগে পটচিত্র জনপ্রিয় হচ্ছে। বিদেশিদের কাছেও তা পছন্দের। তবে এই ধরনের কাজ করতে গেলে, বড় সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ও জরুরি।’ এই ব্যাপারেও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের গবেষক সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল পটচিত্রের আধুনিকীকরণ। এই শিল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা। সেই কাজে আমরা অনেকটাই সফল। শিল্পীদের সঙ্গেও বিদেশের যোগাযোগ নিবিড় হয়েছে। আমরাও চেষ্টা করছি এই কাজে যদি বড় সংস্থাকে যুক্ত করা যায়, তা হলে সকলেই উপকৃত হবেন।’

    পটচিত্রের এই আধুনিকীকরণ দেখে খুশি বছর সত্তরের শিল্পী দুঃখুসানা চিত্রকর। বলেন, ‘একটা সময়ে এই শিল্প লুপ্ত হতে বসেছিল। কেউই কিনতেন না পটচিত্র। কলকাতায় চার-পাঁচটা পটচিত্র নিয়ে গেলে বড়জোড় দু’-তিনটে বিক্রি হতো। তাও এক-একটার দাম ২৫ টাকার বেশি হতো না। নয়া থেকে কিছুটা পায়ে হেঁটে, কিছুটা বাসে, তার পরে ট্রেনে গিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে ৭৫ টাকা মিলত কখনও-সখনও। এই কারণে বাপ-ঠাকুরদার এই পেশা ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছিলেন শিল্পীরা। কিন্তু এত অভাবের মধ্যেও এই পেশাকে আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। সেই দুঃখ এখন শেষ বলেই মনে হচ্ছে।’



    আনোয়ার চিত্রকরও বলেন, ‘আগে প্যান্ডেলের কোনও কোনও অংশে পটচিত্র বানানো হতো। এখন পুরো প্যান্ডেলের দায়িত্ব পাচ্ছি। তাই ভেবেছি, ঠাকুর-দেবতা তো থাকবেই। সামাজিক বার্তাও দিতে হবে।’ এ বার বাহাদুর চিত্রকরের সঙ্গে তিন পুজো কমিটির কথাবার্তা চলছে। বাহাদুর বলেন, ‘এখন পুজো প্যান্ডেলে পটচিত্রের চাহিদা বাড়ছে। আমরাও দর্শকদের বিনোদনের জন্য পটচিত্রের প্যান্ডেলকে কী ভাবে আকর্ষণীয় করা যায়, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছি।’

  • Link to this news (এই সময়)