• মুসলিম মোহ ভুলে উত্তরপ্রদেশে ব্রাহ্মণদের সন্তুষ্ট করার ছক অখিলেশের! নেপথ্যে কোন অঙ্ক?
    প্রতিদিন | ০৭ আগস্ট ২০২৬
  • নরম হিন্দুত্ব। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে এই নীতি নিয়ে দেশজুড়ে প্রচার করেছিলেন রাহুল গান্ধী। নিজেকে পৈতেধারী ব্রাহ্মণ হিসাবে প্রচার করা, মন্দিরে মন্দিরে নিয়মিত ‘টেম্পল রান।’ সেভাবে সাফল্য আসেনি। প্রায় অর্ধযুগ বাদে রাহুলের সেই ব্যর্থ নীতি নিয়ে ফের পথে নামছেন অখিলেশ যাদব (Akhilesh Yadav)। এবার তিনি যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে নরম হিন্দুত্বের লাইনে নির্বাচনে যাওয়ার ছক কষছেন। তাঁর হাতিয়ার দু’টি। এক, রাম মন্দিরে চুরি। দুই, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিজেপির প্রতি অসন্তোষ।

    গত লোকসভা নির্বাচনে অখিলেশের পিডিএ এবং রাহুল গান্ধীর সংবিধান বাঁচানোর ডাক ভালো সাফল্য দিয়েছিল বিরোধী জোটকে। কিন্তু অখিলেশ জানেন, লোকসভার লড়াই এবং বিধানসভার লড়াই এক নয়। বিধানসভার লড়াইয়ে জিততে হলে শুধু পিছড়া-দলিত এবং অল্পসংখ্যক অর্থাৎ সংখ্যালঘু এই ভরসায় থাকলে হবে না। ভুলে গেলে চলবে না বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু মায়াবতীও ফ্যাক্টর। তাই ‘দলিত’ ভোটব্যাঙ্ক কতটা তাঁর থাকবে, তা নিয়ে সন্দিহান সপা সুপ্রিমো। তাই অখিলেশ চাইছেন, সরাসরি বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসাতে। সেকারণেই ব্রাহ্মণ ভোটব্যাঙ্কে হাত বাড়াতে মরিয়া সপা সুপ্রিমো। গত ৫ আগস্ট লখনউতে ব্রাহ্মণদের একটি সমাবেশ করেছেন অখিলেশ। সেখানেই তিনি বলেন, “পিডিএ-র পিডি-র অর্থ পণ্ডিত। পিডিএ-কে শুধু পিছড়া, দলিত ও সংখ্যালঘুদের জোট হিসাবে দেখার প্রয়োজন নেই। পণ্ডিত বা ব্রাহ্মণরাও এই জোটের অংশ।” যোগী আদিত্যনাথের আমলে ব্রাহ্মণরা যে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছেন, সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন অখিলেশ। এখানেই থামবে না সমাজবাদী পার্টি। নভেম্বর থেকে উত্তরপ্রদেশজুড়ে রথযাত্রা করবে সমাজবাদী পার্টি। যাতে মূল দাবি হবে, ‘রাম মন্দিরের অনুদান চোরদের শাস্তি দেওয়া।’ রাজ্যের সব বড় শহর হয়ে প্রায় প্রতিটি বিধানসভায় যাবে ওই রথযাত্রা।

    আসলে অখিলেশ মনে করছেন, বিজেপির প্রতি উচ্চবর্ণ-বিশেষত ব্রাহ্মণরা বীতশ্রদ্ধ। কারণ বহু বছর ধরে বিজেপির প্রতি অনুগত থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণরা সম্মান পাচ্ছেন না। সরকারে তাঁদের অংশিদারিত্ব কম। ওবিসি ভোটারদের দলে টানতে গিয়ে ব্রাহ্মণদের ক্ষেপিয়ে ফেলেছে গেরুয়া শিবির। তাছাড়া সামাজিকভাবেও ব্রাহ্মণদের গুরুত্ব কমছে। যেটার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বিহারের বাঁকিপুরের উপনির্বাচনে। আসলে উত্তরপ্রদেশে ব্রাহ্মণ ভোটের বড় অংশ গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজেপির সঙ্গেই থেকেছে। উত্তরপ্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮-১২ শতাংশ ব্রাহ্মণ। সব মিলিয়ে প্রায় ১০৩টি আসনে বেশ ভালোরকম প্রভাব রয়েছে ব্রাহ্মণ ভোটারদের।

    সমাজবাদী পার্টি সূত্র বলছে, এখন থেকে বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত অখিলেশকে মূলত নরম হিন্দুত্বের লাইনেই খেলতে দেখা যাবে। সেভাবে সংখ্যালঘুদের ইস্যুতে তিনি সরব হবেন না। কারণ, সংখ্যালঘুদের প্রতি বেশি ‘প্রেম’ দেখালে আর যা-ই হোক উচ্চবর্ণের হিন্দু ভোটারদের মন পাওয়া যাবে না। ইতিমধ্যেই দলের অন্যতম মুসলিম মুখ আজম খানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানো শুরু করেছেন সপা সুপ্রিমো। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, তাহলে কি মুসলিম ভোটের মোহ পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন সমাজবাদী পার্টি সুপ্রিমো? নাকি অন্য কোনও ছক।

    আসলে অখিলেশ মনে করছেন, মুসলিম ভোট এমনিও ইন্ডিয়া জোটের শিবিরেই পড়বে। তেমন হলে জোটের শরিক কংগ্রেসের স্থানীয় নেতারা মুসলিমদের ইস্যু নিয়ে সরব হবেন। ইমরান মাসুদ-দানিশ আলির মতো প্রথম সারির কংগ্রেস নেতাদের সেই দায়িত্ব দেওয়া হবে। আসলে অখিলেশ কোনওভাবেই সমাজবাদী পার্টিকে ‘মুসলিমপন্থী’ দল হিসাবে তুলে ধরতে নারাজ। শোনা যাচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনগুলিতে সমাজবাদী পার্টির তুলনায় কংগ্রেসের প্রার্থী বেশি থাকবে। এমনকী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাতেও অমুসলিম প্রার্থী রাখতে পারেন তিনি। সমাজবাদী পার্টির ধারণা, অতীতে মায়াবতী দলিত-ব্রাহ্মণ এই সমীকরণে সরকার চালিয়েছেন। এবারও বিজেপির ব্রাহ্মণ ভোট ভাঙাতে পারলে ব্রাহ্মণ-পিছড়া তত্ত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতেই পারেন তিনি। সেই সঙ্গে মুসলিম ভোট বিজেপি বিরোধী হিসাবে বিরোধী শিবিরেই পড়বে। এখন দেখার সপা সুপ্রিমোর সেই ছক কতটা সফল হয়। বিজেপিকে নরম হিন্দুত্বের ছকে হারানোটা যে বেশ কঠিন সেটা কিন্তু রাহুল গান্ধী আগেই টের পেয়েছেন।
  • Link to this news (প্রতিদিন)