• সমুদ্রের মতো ঢেউ উঠছে কুয়োর জলে, ভূমিকম্প নয়, গুজরাটে মোরবিতে ‘ভূতুড়ে’ কাণ্ড?
    এই সময় | ০৭ আগস্ট ২০২৬
  • ভূমিকম্পের দূরদুরান্ত পর্যন্ত কোনও আশঙ্কা নেই। আশপাশের পুকুর, খাল-বিলের জলও স্থির। কিন্তু লাগাতার কাঁপছে কুয়োর জল। সমুদ্রের মতোই দফায় দফায় ঢেউ কুয়োর জলে। এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গুজরাটের মোরবি জেলার বীরপারদা গ্রামে। এক-দু’ঘণ্টা নয়, টানা কয়েক দিন ধরে ওই গ্রামে এক কুয়োর জলে উঠছে সমুদ্রের মতো ঢেউ!

    আশপাশের বাসিন্দারা কুয়োর জলকে এ ভাবে দুলতে দেখে হতবাক। সোশ্যাল মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে ঘটনার ভিডিয়োও। প্রথমে ভূমিকম্পের সঙ্গে এই ঘটনার যোগ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হলেও প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে এখনও কোনও ভূমিকম্প বা ভূকম্পন ধরা পড়েনি। তদন্তে বিশেষজ্ঞদের ডাক।

    গুজরাটের মোরবি তালুকের বীরপরদা গ্রামের (Virparda village) কৃষক প্রাণজীবন সাদারিয়ার (Pranjivan Sadariya) খামারে থাকা প্রায় ১৮ ফুট গভীর কুয়োয় এই অস্বাভাবিক ঘটনা দেখা গিয়েছে। গত ২ অগস্ট প্রথম ওই কুয়োর জলে এমন কম্পন লক্ষ্য করেন স্থানীয়রা। কুয়োর জল স্থির না থেকে ক্রমাগত সাগরের ঢেউয়ের মতো কাঁপতে ও দুলতে শুরু করে। দুলুনির চোটে প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ কুয়োর জল উপচে বাইরেও বেরিয়ে আসছিল। প্রথমে অনেকে একে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলে মনে করেন। কিন্তু পরে দেখা যায় এমন কিছুই ঘটল না। এর পরেই ছড়ায় চাঞ্চল্য। ভূতুড়ে-অলৌকিক কাণ্ড হিসেবেও ছড়ায় গুজব।

    স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ দিন ধরে কুয়োর জল এ ভাবে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে। ঘটনার ভিডিয়ো সামনে আসার পরে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, ভূমিকম্পের আগে কি এমন ভাবে কুয়োর জলে ঢেউ উঠতে পারে? কেউ কেউ ভূগর্ভে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তনের আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।

    কুয়োর জলের অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হলেও আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় কোনও উল্লেখযোগ্য ভূকম্পন রেকর্ড হয়নি। ফলে ঘটনাটিকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার কোনও কারণ আপাতত নেই।

    প্রশাসনের তরফে ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত এবং মাটির নীচের জলপ্রবাহ—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    অস্বাভাবিক ঘটনাটি নিয়ে গ্রামে কৌতূহল যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনই আতঙ্কও ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সরকারি বিশেষজ্ঞদের দল তদন্ত করছে। মাটির নীচের জলস্তর, কুয়োর গঠন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত এবং আশপাশের ভূ-প্রাকৃতিক পরিস্থিতি পরীক্ষা করা হচ্ছে।

    বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টির কারণে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে পারে। জলস্তর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির নীচের বিভিন্ন স্তরে জলের চাপও পরিবর্তিত হয়। সেই চাপ কোনও নির্দিষ্ট পথে কুয়োর জলের উপর প্রভাব ফেললে জলে ঢেউ তৈরি হতে পারে।

    আরও একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ভূগর্ভে আটকে থাকা বাতাসের চাপের পরিবর্তনের কথাও সামনে এসেছে। ভূগর্ভস্থ জল দ্রুত কুয়োয় ঢুকলে বা জলস্তরের চাপ বদলালে আটকে থাকা বাতাসের গতিবিধিও জলের উপরিভাগে ঢেউ তৈরি করতে পারে বলে দাবি। জেলা ভূতত্ত্ববিদ জেএস ভাধের বলেছেন, ‘প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে যে, ভারী বৃষ্টিপাতের পরে ভূগর্ভস্থ জল স্তর পুনরায় ভরে উঠেছে এবং পাথরের ছিদ্রপথে সেখানে আটকে থাকা বাতাস বেরিয়ে আসছে, যা কুয়োর জলে এমন আলোড়ন সৃষ্টি করছে।’

    মোরবি জেলার কালেক্টর স্বপ্নিল খারে বলেছেন,‘বীরপারদা গ্রামের ওই কুয়ো নিয়ে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের ভিত্তিতে শুক্রবার জেলা ভূতত্ত্ববিদেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, কুয়োর জলে এই নড়াচড়ার সম্ভাব্য কারণ হল জলের নীচে আটকে থাকা বায়ু। সেই আটকে থাকা বায়ু স্থান পরিবর্তন করলে জলের উপরিভাগে ঢেউয়ের মতো নড়াচড়া তৈরি হয়। বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করতে গুজরাট গ্রাউন্ডওয়াটার রিসার্চ ইনস্টিটিউটকেও সমীক্ষা চালিয়ে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তবে এগুলি এখনও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। চূড়ান্ত কারণ জানতে বিশেষজ্ঞদের তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

    ভূমিকম্পের সময় ভূগর্ভস্থ জলস্তর বা কুয়োর জলে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে—এমন বৈজ্ঞানিক নজির রয়েছে। ভূমিকম্পের কম্পনের ফলে ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ, জলের চাপ কিংবা জলস্তরে পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কুয়োর জল দুললেই ভূমিকম্প আসন্ন। মোরবির ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কোনও ভূমিকম্প রেকর্ড হয়নি। তাই এই ঘটনাকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলে দাবি করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফলে আপাতত মোরবির এই কুয়ো ঘিরে রহস্য পুরোপুরি কাটেনি।

  • Link to this news (এই সময়)