• গৃহবধূ থেকে নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি, প্রণতির উত্থান এক মহিলা নেত্রীর আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প
    এই সময় | ০৭ আগস্ট ২০২৬
  • গৃহবধূ থেকে জেলা পরিষদের সভাধিপতি। নদিয়ার রাজনীতিতে প্রণতি বিশ্বাস শুধু লড়াই নয়, গ্রামীণ রাজনীতিতে এক নেত্রীর আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্পও। কংগ্রেসের হাত ধরে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরে তৃণমূলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। আবার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক টানাপড়েনে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরেও দাঁড়িয়েছিলেন এক সময়ে। সেখান থেকেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়ে আজ তিনি নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি।

    ১৯৯৮-তে রাজনীতিতে পা রাখেন প্রণতি বিশ্বাস। প্রয়াত কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন সাংসদ আনন্দমোহন বিশ্বাসের হাত ধরেই তাঁর পথচলার সূচনা। তখন থেকেই সংগঠনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। ধীরে ধীরে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

    ২০০৮-এ তৃণমূলে যোগ দেন প্রণতি। পঞ্চায়েত নির্বাচনে দক্ষিণপাড়া–২ গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে প্রার্থী হন। জিতেও যান। প্রধান করা হয় তাঁকে। প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলে এলাকায় নিজের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়িয়ে নেন অনেকটা।

    ২০১৩-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে হাঁসখালি পঞ্চায়েত সমিতির নারী, শিশু ও ত্রাণ দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। সংগঠন এবং প্রশাসন—দুই ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার ছাপ রাখতে শুরু করেন তিনি।

    ২০১৬-য় কৃষ্ণগঞ্জের প্রয়াত বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে মতানৈক্য শুরু হয়। সেই সময়ে কিছুদিন সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান প্রণতি বিশ্বাস। অনেকে মনে করেছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায় হয়তো এখানেই শেষ হয়ে গেল।

    কিন্তু সব ধারণা ভুল প্রমাণিত করে দেন প্রণতি। রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকারের হাত ধরে ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। প্রণতিকে প্রার্থীও করে পদ্মশিবির। কিন্তু জিততে পারেননি। তাঁর অভিযোগ ছিল, ফল ঘোষণার দিন তাঁকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়।

    তবে এই পরাজয় থামাতে পারেনি তাঁকে। বরং বিজেপি তাঁকে হাঁসখালি ব্লকের সভাপতির দায়িত্ব দেয়। ২০১৯-এ জেলা কমিটিতে জায়গা পান। পরে জেলা সহ-সভাপতির দায়িত্বও সামলান।

    ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে ফের জয়ী হন প্রণতি। ২০২৬-এ রাজ্যে পালাবদল ঘটে। তার পরেই গত ১৭ জুন নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি তারান্নুম সুলতানার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন তৃণমূলের ২৭ জন সদস্য। এই জেলা পরিষদের মোট আসন সংখ্যা ছিল ৫২। বিজেপির হাতে ছিল মাত্র ৬ জন সদস্য।

    সেই অনাস্থা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৫ অগস্ট আস্থা ভোট হয়। আশ্চর্যজনক ভাবে তৃণমূল কংগ্রেস কোনও প্রার্থী দেয়নি। ফলে নিজের দলের মাত্র ছয় জন সদস্যের পাশাপাশি তৃণমূলের ১৫ জন সদস্যের সমর্থন নিয়ে নতুন সভাধিপতি নির্বাচিত হন প্রণতি।

    সেই ভোটের ফলেই নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি নির্বাচিত হন প্রণতি বিশ্বাস। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে এ যেন তাঁর লড়াইয়ের স্বীকৃতি।

    এক বৃত্তের পূর্ণতা

    কংগ্রেসে হাতেখড়ি, তৃণমূলে সাংগঠনিক উত্থান, রাজনৈতিক বিরতি, বিজেপিতে নতুন করে শুরু এবং শেষ পর্যন্ত জেলা পরিষদের শীর্ষ পদ—প্রণতি বিশ্বাসের রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই সংগ্রাম, ধৈর্য এবং প্রত্যাবর্তনের গল্প।

  • Link to this news (এই সময়)