• উদ্বোধনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গর্তে ভর্তি ৪২ হাজার কোটির এক্সপ্রেসওয়ে, জল শুকোতে চালাতে হলো পাখা!
    এই সময় | ০৮ আগস্ট ২০২৬
  • উদ্বোধনের এক মাসও কাটেনি। তার মধ্যেই রাস্তার একাংশে ধস। পাশাপাশি জল জমে ক্ষতিগ্রস্ত সদ্য চালু হওয়া কানপুর-লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে। ধসে গেল রাস্তার একাংশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের জল শুকিয়ে রাস্তা মেরামতির কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য বসানো হয়েছে একাধিক উচ্চ-ক্ষমতার বৈদ্যুতিক পাখা। সেই ছবি ও ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে, কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি নতুন এক্সপ্রেসওয়ের এমন হাল কেন? প্রশ্নের মুখে রাস্তার নির্মাণমানও।

    প্রায় ৪,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি কানপুর-লখনউ এক্সপ্রেসওয়েটি গত ১৩ জুলাই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গড়করি এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার কাছে রাস্তার একাংশে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। নতুন তৈরি হওয়া রাস্তার প্রায় ৩০০ মিটার অংশের পিচ উঠে নীচের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে বলে খবর। ভারী বৃষ্টির পরে ওই অংশে জল জমে যাওয়ার পাশাপাশি রাস্তার নীচের মাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে NHAI।

    NHAI আধিকারিকদের বক্তব্য, টানা বৃষ্টির জেরে রাস্তার বিটুমিন স্তরের নীচে জল ঢুকে গিয়েছে। এর ফলে রাস্তার বিভিন্ন স্তর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাস্তার একাংশের আস্তরণ পুরো উঠে যায়। মেরামতির আগে সেই অংশের নির্মাণ সামগ্রী ও মাটির অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমানো জরুরি। বৃষ্টি চলতে থাকায় স্বাভাবিক ভাবে শুকোতে সময় লাগছিল। তাই দ্রুত শুকোনোর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশে উচ্চক্ষমতার পেডেস্টাল ফ্যান ও এক্সহস্ট ব্লোয়ার বসানো হয়। একাধিক ফ্যান পাশাপাশি রেখে জল ও আর্দ্রতা সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই দৃশ্যই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে শুকোতে বিশাল পাখা ব্যবহার করায় নেটিজেনদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় পরিকাঠামো প্রকল্পে জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নির্মাণের গুণমান ঠিক ছিল কি না।

    কর্তৃপক্ষের দাবি, শুধু বৈদ্যুতিক পাখার উপর নির্ভর করে মেরামতির কাজ হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জল ও ভেজা ভাব কমাতে টারপলিন শিট, এয়ার-ড্রাইং মেশিন এবং হাই-ইনটেনসিটি পেভমেন্ট ক্লিনিং সরঞ্জামও ব্যবহার করা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কাজ বারবার ব্যাহত হচ্ছে। মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাস্তার ওই অংশে যান চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়েছে ।

    রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কারণে কানপুর ও লখনউ—দুই দিকের যানবাহনকেই একটি ক্যারেজ়ওয়ে দিয়ে চালানো হচ্ছে। প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকায় এই ব্যবস্থা থাকায় ব্যস্ত সময়ে যানজট তৈরি হচ্ছে। এ নিয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েকজন গাড়িচালকের অভিযোগ, টোল প্লাজ়া পার হওয়ার পরে তাঁদের এমন রাস্তায় ঢুকতে হচ্ছে যেখানে বিপরীত দিক থেকেও গাড়ি চলাচল করছে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।

    সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ক্ষতিগ্রস্ত ওই জায়গাটিই এর আগে একবার মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর এক্সপ্রেসওয়ের আরও সাত থেকে আটটি জায়গায় রাস্তার উপরের অংশের আস্তরণ উঠে গিয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অংশের সমস্যা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

    রাস্তার এই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ জানতে IIT খড়গপুরকে প্রযুক্তিগত তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে NHAI। পাশাপাশি গোটা এক্সপ্রেসওয়ের পেভমেন্টের অবস্থা পরীক্ষা করতে লেজ়ার প্রোফাইলোমিটার সার্ভের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করেই বিষয়টি শেষ করতে চাইছে না কর্তৃপক্ষ। পুরো রাস্তার গুণমান ও কাঠামোগত অবস্থাও পরীক্ষা করা হবে।

    এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাকে নোটিস দিয়েছে NHAI। সংস্থাটিকে ‘নন-পারফর্মিং কনট্রাক্টর’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এ দিকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামতির আনুমানিক খরচ প্রায় ৩ কোটি টাকা, যা ঠিকাদার সংস্থাকেই বহন করতে হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা কয়েকজন আধিকারিককেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দু’বছরের জন্য NHAI ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের প্রকল্পে অংশ নেওয়া থেকে তাঁদের ব্যান করা হয়েছে।

    উদ্বোধনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নতুন এক্সপ্রেসওয়ের রাস্তার একাংশে ধস, জল জমা এবং মেরামতির সময় বিশাল বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের ছবি এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়।

  • Link to this news (এই সময়)