এই সময়, নয়াদিল্লি: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলো। প্রাতরাশ সহযোগে বৈঠকও হলো। কারা ছিলেন সেই বৈঠকে?
লোকসভার বিদ্রোহী তৃণমূল (বর্তমানে এনসিপিআই) সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় থেকে শুরু করে এনসিপিআইয়ের মধ্যে বেসুরো আবু তাহের, খলিলুর রহমান, ইউসুফ পাঠানও।
কী বললেন নমো?
বৈঠকে উপস্থিত সাংসদদের অনেকের মুখে শোনা গেল, সংসদে তাঁদের ভূমিকা যেমন মনে করিয়ে দিয়েছেন মোদী, তেমনই বাংলার অতীত গৌরবের কথাও তুলে ধরেছেন। তবে সবারই নজর কেড়েছে এই আলাপচারিতায় প্রধানমন্ত্রী যোগাভ্যাস নিয়ে বেশকিছু পরামর্শ দেওয়ায়।
গত কয়েকদিনের ঘটনা পরম্পরার প্রেক্ষিতে কলকাতা ও দিল্লির রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা, প্রধানমন্ত্রীর এই ‘যোগবার্তা’য় কি মনে বল পেলেন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা? দোলাচল কাটল কি তাহের, খলিলুরদের? আপাতত রাজনীতির যোগ–বিয়োগের অঙ্ক কষতে ব্যস্ত সবাই।
তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইতে যোগ দিলেও লোকসভার স্পিকারের স্বীকৃতি এখনও পাননি সুদীপ, কাকলিরা৷ অভিযোগ, নিজের নিজের এলাকায় উন্নয়মুখী কাজও করতে পারছেন না তাঁদের অনেকে৷ কারও কারও বিরুদ্ধে আবার নিজের এলাকাতেই ‘গদ্দার’ পোস্টার পড়ছে পাড়ার দেওয়ালে৷ গত কয়েক সপ্তাহে কখনও মোদীর সঙ্গে সুদীপ, শতাব্দী, কখনও অমিত শাহের সঙ্গে জুন মালিয়া, কখনও জেপি নাড্ডা, আবার কখনও শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিদ্রোহী সাংসদরা বৈঠক করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী সব এনসিপিআই (শুধু দেব ছিলেন না) সাংসদের সঙ্গে মিটিং করায় তার তাৎপর্য যথেষ্ট।
সূত্রের খবর, প্রাতরাশ বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, স্বাস্থই সম্পদ। অর্থাৎ, শরীর–স্বাস্থ্য ভালো থাকলে বাদবাকি সব কিছুই থাকবে। এনসিপিআইয়ের পাশাপাশি উদ্ধব ঠাকরের শিবির থেকে একনাথ শিন্ডের শিবসেনায় যোগদানকারী ছ’জন সাংসদও এ দিন হাজির ছিলেন বৈঠকে। সবার কাছে মোদী জানতে চান, যে সব সাংসদের বয়স ৪০ পেরিয়েছে, তাঁরা প্রতিদিন যোগাসন করেন কি না। রোজ যাঁরা যোগ করেন, তাঁদের হাত তুলতেও বলেন নমো। বাংলার সাংসদরা যে তেমন একটা স্বাস্থ্য সচেতন নন, সেটা সম্ভবত টের পেয়েই প্রধানমন্ত্রী তাঁদের বছরে অন্তত এক বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
তবে এ সবের পাশাপাশি উন্নয়ন, অগ্রগতির কথাও এনসিপিআই সাংসদদের বলেছেন মোদী। সূত্রের দাবি, বৈঠকে নিজের কেন্দ্র এবং রাজ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করার বার্তা দিয়ে নমো বলেন, ‘রাজ্যগুলির অগ্রগতি হলে, তবেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব।’ তাঁর সংযোজন, ‘এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং ওডিশা দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। তারা হয়ে উঠেছিল ভারতের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক।’ বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতি বিশ্বের কাছে এক শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং আত্মবিশ্বাসী ভারতের বার্তা পৌঁছে দেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এই এমপি–দের সংসদীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও একাধিক পরামর্শ দেন মোদী। সূত্রের খবর, তিনি বলেন, ‘নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থাকুন। বিতর্ক, আলোচনায় সক্রিয় ভাবে অংশ নিন।’ প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘ভারতের সমৃদ্ধ সভ্যতা, সংসদীয় ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য ও উপকরণ সংসদে রয়েছে। সাংসদদের সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেকে তুলে ধরার জন্য ‘এটাই ভারতের সময়’ বলে মনে করেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘গোটা বিশ্বের নজর এখন ভারতের দিকে। আন্তর্জাতিক দুনিয়া জানতে চায়, ভারত কী ভাবে এগোচ্ছে, কোন পথে উন্নয়নের কাজ চলছে।’ তাই দেশের অগ্রগতির এই অধ্যায়ে প্রতিটি সাংসদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বেরিয়ে হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বললেন, আপনারা ভালো করে কাজ করুন। আপনাদের লক্ষ্যই হলো, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, দেশের জন্য কাজ করা।’ বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়ের কথায়, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের সবার সঙ্গে খুব ভালো করে কথা বলেছেন, গল্প করেছেন। প্রত্যেককে সংসদীয় এলাকায় গিয়ে উন্নয়নের কাজ করতে বলেছেন। এটাও বলেছেন যে, যাঁদের ৪০-এর উপরে বয়স, তাঁরা বছরে এক বার স্বাস্থ্যপরীক্ষা করাবেন, যোগাসন করবেন।’ উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আগে কখনও এমন বৈঠকে যোগ দিইনি। আমাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব ভারতের উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’ তবে লোকসভার স্পিকারের স্বীকৃতি কবে পাবেন এনসিপিআই সাংসদরা, নিজের এলাকায় কবে থেকে আবার নির্বিঘ্নে উন্নয়নের কাজ শুরু করতে পারবেন— এমন নানা প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের সদুত্তর কি প্রধানন্ত্রীর সঙ্গে প্রাতরাশ সারতে সারতে পেলেন বিদ্রোহী সাংসদরা? তা নিয়ে অবশ্য কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি এনসিপিআই শিবির থেকে।
এ দিন প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশে হাজির ছিলেন মুর্শিদাবাদের তিন সংখ্যালঘু সাংসদ আবু তাহের খান, খলিলুর রহমান এবং ইউসুফ পাঠান৷ তাঁরা এনসিপিআই-তে থাকলেও এনডিএ শিবিরে থাকবেন না বলে একাধিকবার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন৷ তাই সাম্প্রতিক অতীতে এনডিএ-র বৈঠকেও গরহাজির ছিলেন তাঁরা৷ তবে এ দিন কাকলি–সুদীপদের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রাতরাশ সারতে যান আবু তাহেররা। যা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বেরিয়ে আবু তাহের বলেন, ‘আমরা পশ্চিমবঙ্গ তথা মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি। রাজ্যে সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন ভাবে অত্যাচারিত হচ্ছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই বিষয়ে আমরা জানিয়েছি।’ শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে একই দাবিতে ডেপুটেশন দিয়েছিলেন তাঁরা৷
এ দিনের বৈঠকের ফাঁকে মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বাপি হালদার প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন, আগামী বছরের গঙ্গাসাগর মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য৷ প্রধানমন্ত্রীকে কাঁথা স্টিচের উত্তরীয় উপহার দিয়েছেন সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার৷ বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত কাঁথা স্টিচের ঐহিহ্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা করেন কলকাতা দক্ষিণের সাংসদ মালা রায়ও৷ কাঁথা স্টিচের বিষয়ে সাংসদ মালা রায়ের থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা শুনে তাকে ধন্যবাদও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তবুও দিনের শেষে প্রশ্নটা থেকেই গেলো—ঠিক কী কী আশ্বাস প্রধানমন্ত্রী দিলেন তাঁদের?
এই বৈঠক নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে কটাক্ষের সুরে কালীঘাট–তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় বলেন, ‘ওঁদের অনেকেই বুঝতে পারছেন না কোন দিকে যাবেন। তাই এক একদিন এক একজনের সঙ্গে বৈঠক করতে হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহার করে, তৃণমূলের টাকাতে ওঁরা ভোটে লড়েছিলেন। এখন অন্য সুর গাইছেন। আবার ওঁদের মধ্যে অনেকে ওখানে (এনসিপিআইয়ে) থাকতেও চাইছেন না।’ এনসিপিআইয়ের মধ্যে মতবিরোধ নিয়ে জল্পনা প্রসঙ্গে বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি তথা পদ্মের রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, ‘এনসিপিআই একটি নতুন দল। তৃণমূল কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পরে ২০ জন সাংসদ একত্রিত হয়ে একটি দল গঠন করেছেন অথবা এখন একটি নতুন দলে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কেউ যদি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, তবে সেটা দেখার দায়িত্ব এনসিপিআইয়ের, বিজেপির নয়।’