• ইতিহাসের স্মৃতি কি মুছে যাবে? ট্যাংরার ঐতিহ্যের লাওৎজে মন্দির ঘিরে আইনি টানাপোড়েন
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৯ আগস্ট ২০২৬
  • কলকাতার ট্যাংরা এলাকার ঐতিহাসিক লাও ৎজে মন্দিরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের পরিচালনা ও দখল-অধিকার নিয়ে বিরোধ এবার নয়া মোড় । একক বেঞ্চের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে দায়ের করেছে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা মন্দির কমিটি। মামলার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন”দীর্ঘদিনের বাস্তবিক পরিচালনা, নিবন্ধিত লিজ, ট্রাস্ট ডিড এবং সরকারি নথির ভিত্তিতে কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার অধিকার কতটা সুরক্ষিত”?

    শুধু একটি উপাসনালয় নয়, ট্যাংরার চীনা সম্প্রদায়ের বহু বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক এই লাও ৎজে মন্দির। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উৎসব এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। সেই ঐতিহ্যকেই ধুলিস্যাৎ করতে উদ্যোগী হয়েছে একদল অসাধু ব্যক্তি বলে অভিযোগ। আগামী দিনে কাদের দায়িত্বে থাকবে ঐতিহ্যশালী চিাদের এই মন্দির তা সামনে রেখে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মন্দির পরিচালনার দাবি করা পক্ষ।

    মামলাকারীদের দাবি, তাঁরা এবং প্রোফর্মা বিবাদী পক্ষ ৭ সকলেই Lee Sye Association-এর পদাধিকারী। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁরাই মন্দিরের দৈনন্দিন প্রশাসন, পূজা-পার্বণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই দায়িত্ব কোনও সাময়িক ব্যবস্থা নয়; বরং বহু বছরের স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত পরিচালন প্রথার ধারাবাহিকতা।

    মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালে শ্রী ঈশ্বর প্রহ্লাদেশ্বর জিউ শিব ঠাকুর (প্রহ্লাদ ফ্যামিলি ট্রাস্ট)-এর সঙ্গে একটি নিবন্ধিত লিজ চুক্তি হয়েছিল। পরে ১৯৮৯ সালে মন্দির পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্ট ডিড এবং ২০১৫ সালে একটি ডিড অব এগ্রিমেন্ট কার্যকর হয়। মামলাকারীদের দাবি, এই ধারাবাহিক আইনি নথিই তাঁদের পরিচালনার অধিকারকে বৈধতা দিয়েছে এবং সেই ভিত্তিতেই বছরের পর বছর মন্দির পরিচালিত হয়েছে।

    শুধু তাই নয়, তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী কলকাতা পুরসভার নথিতে Lao Tze Temple-এর নাম নথিভুক্ত রয়েছে এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিয়মিত সম্পত্তি কর পরিশোধ করা হয়েছে। মন্দিরের বিদ্যুৎ সংযোগও একই নামে রয়েছে। এই সরকারি নথিগুলিকে তাঁরা আদালতে তাঁদের দীর্ঘদিনের দখল ও পরিচালনার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

    কিন্তু বিরোধের সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালে লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। মামলাকারীদের অভিযোগ, এরপর থেকেই মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ তীব্র হতে থাকে। তাঁদের দাবি, ২০২৬ সালের ১৪ মে কয়েকজন ব্যক্তি প্রহ্লাদ ফ্যামিলি ট্রাস্ট-এর নাম ব্যবহার করে মন্দিরের দখল নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। অভিযোগ দায়ের করা হয় প্রগতি ময়দান থানায়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ মামলাকারীদের।

    পুলিশি হস্তক্ষেপ না হওয়ায় তাঁরা কলকাতা হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বিচারপতি পার্থ সারথি সেন মামলাকারীদের আবেদন খারিজ করে দেন। সেই নির্দেশকেই চ্যালেঞ্জ করে বর্তমানে হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে মামলা দায়ের করেন।

    মামলার প্রথম পর্বের সুনানিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ডিভিশন বেঞ্চ ইতিমধ্যেই পুলিশের তদন্তকারী আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে যে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল প্রগতি ময়দান থানায় তার তদন্তের গতিপ্রকৃতি কতদূর এগিয়েছে। আগামী শুনানিতে তার রিপোর্ট আকারে জমা দিতে হবে।

    আইনজীবীদের একাংশের মতে, এই মামলার গুরুত্ব শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দখল নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্য ইতিহাস এবং ভাবাবেগ।এখানে আদালতকে বিবেচনা করতে হতে পারে—নিবন্ধিত লিজ, ট্রাস্ট ডিড, বাস্তবিক দখল, দীর্ঘদিনের পরিচালনা এবং সরকারি নথির মধ্যে আইনি গুরুত্বের ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক ট্রাস্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে এই মামলার রায় ভবিষ্যতে নজির হয়ে উঠতে পারে।

    অন্যদিকে, বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ভক্ত ও স্থানীয় মানুষের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বহু মানুষের আশা, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে শুধু আইনি জটিলতারই অবসান হবে না, বরং বহু বছরের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিবেশও অক্ষুণ্ণ থাকবে।

    তবে এই মুহূর্তে ডিভিশন বেঞ্চ মামলার চূড়ান্ত রায় বা বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেনি। ফলে ট্যাংরার ঐতিহাসিক লাও ৎজে মন্দিরের পরিচালনার অধিকার শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত আদালতের রায়ের অপেক্ষায়। এখন নজর কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পরবর্তী শুনানির দিকে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)