সৌমেন রায়চৌধুরি
৯ অগস্ট, ২০২৪। আরজি কর হাসপাতাল থেকে ফোন এল বাড়িতে। অভিযোগ, সেই ফোনে জানানো হয়, ‘আপনাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।’ অসহায় মা-বাবা ছুটতে ছুটতে যান হাসপাতালে। গিয়ে দেখেন মেয়ের নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। জানতে পারেন, তাঁদের মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। মাঝে দুটো বছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু মেয়েকে হারানোর যন্ত্রণা আজও কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে দু’জনকে। রবিবার অভয়া দেবনাথ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণসভায় নিজেদের মেয়ের নানা জানা অনেক কথা দর্শকদের সামনে তুলে ধরলেন তাঁরা। কান্নায় চোখ ভিজে এল নির্যাতিতার মায়ের। শোকস্তব্ধ গোটা হল। নিশ্চুপে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই প্রশ্ন, ‘বিচার হবে কবে?’
মেয়ের হাতে সাজানো বাগান। তাঁর লাগানো গাছে আজও ফোটে লাল জবা ফুল। কিন্তু তা দেখে যেতে পারেননি নির্যাতিতা। স্মৃতিচারণায় নির্যাতিতার মা বলেন, ‘ছোটবেলায় কথা বলতে শেখার সময় থেকেই তাঁর মেয়ে বলত, মা, আমি ডাক্তার হব।’ সেই স্বপ্নপূরণের লড়াই ছিল মা বাবা-মেয়ে তিনজনের। চিকিৎসক হওয়ার পর রোগীদেরও অত্যন্ত যত্ন সহকারে দেখতেন তিনি। পাড়ার সকলের কাছে বড় প্রিয় মেয়ে।
মরতে বসা জীবনকে বাঁচিয়ে তোলার ক্ষমতা ছিল তাঁর মধ্যে। একদিন রাস্তায় হাঁটার সময়ে একটি প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া রবার গাছ দেখে মেয়ের কথায়, সেটি বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল। সে বলেছিল, মাথার অংশটুকু বাঁচলেই গাছটা বেঁচে যাবে। আজও সেই গাছটি বেঁচে রয়েছে। যিনি জীবন দান করেছিলেন গাছটির, তিনি আজ নেই। রত্না দেবনাথের কথায়, ‘আমি সত্যিই একটা হিরে পেয়েছিলাম, যেটা আমি হারিয়ে ফেলেছি।’
তবে লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি। আইনের লড়াই চলছে। রত্না দেবনাথের দাবি, এটি শুধু ধর্ষণের ঘটনা নয়, কোনও গোপন তথ্য জেনে ফেলার কারণেই তাঁর মেয়েকে খুন করা হয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস। পাশাপাশি, মেয়েকে শুধু ‘নির্যাতিতা’ হিসেবে নয়, একজন চিকিৎসক হিসেবেই মনে রাখার দাবি জানান তিনি।
সন্তান হারানো মায়ের আর্জি, তিনি চান না ভবিষ্যতে কোনও মেয়েকে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ‘অভয়া’ বা ‘তিলোত্তমা’ হয়ে উঠতে হোক। তাঁর কথায়, পৃথিবী যতদিন থাকবে, ততদিন তাঁর মেয়ে নির্যাতিতা হিসেবে নয়, একজন ডাক্তার হিসেবেই বেঁচে থাকুক এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।