• গাজ়িপুরের গঙ্গায় জোড়া ইলিশ, ২০০ বছর আগে হ্যামিল্টনের দেখা মাছ ফের উত্তরপ্রদেশে
    এই সময় | ১০ আগস্ট ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    ‘অঘটন’ কি এমন ঘটনাকেই বলে? যদি তা–ই হয়, তবে এমন ‘অঘটন’ সব সময়েই স্বাগত বলে মনে করছেন মৎস্যবিজ্ঞানীর দল। দীর্ঘ কয়েক দশকের অনুপস্থিতির পরে উত্তরপ্রদেশের গাজ়িপুরের গঙ্গায় যে ভাবে মাছের রাজা ইলিশকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখা গিয়েছে, তাকে অঘটন ছাড়া আর কী–ই বা বলা যায়! ফরাক্কায় বাঁধ তৈরির পর থেকে গত কয়েক দশক ধরে গঙ্গার মধ্য ও উচ্চ অববাহিকা থেকে কার্যত হারিয়েই গিয়েছে ইলিশ। তার পর হঠাৎই এমন ভাবে তাদের দর্শন‍কে ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন সবাই। যদিও মাত্র দু’টি মাছের দেখা পাওয়াকেই ইলিশের পুরোনো বিচরণক্ষেত্রে ফিরে আসা বলে এখনই মানতে নারাজ বিজ্ঞানীরা।

    ২০২৬–এ উত্তরপ্রদেশে ইলিশের দেখা মেলা নিয়ে নমামি গঙ্গে প্রকল্পের কর্তারা এবং সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ় রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিফরি)–র আধিকারিকরা হইচই জুড়ে দিলেও উত্তরপ্রদেশের মতো সমুদ্র থেকে বহুদূরে থাকা রাজ্যেও ইলিশের দর্শন একটা সময়ে আদৌ কোনও নতুন ঘটনা ছিল না। দু’শো বছরেরও বেশি পুরোনো বৈজ্ঞানিক নথিতে এই রাজ্যে ইলিশ পাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। ১৮২২–এ স্কটিশ চিকিৎসক ও প্রকৃতিবিদ ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন প্রকাশ করেন ‘অ্যান অ্যাকাউন্ট অফ দ্য ফিশেস ফাউন্ড ইন দ্য রিভার গ্যাঞ্জেস অ্যান্ড ইটস ব্রাঞ্চেস’। গঙ্গা ও তার শাখা–প্রশাখায় পাওয়া মাছ নিয়ে ওই যুগান্তকারী গ্রন্থে মিঠে ও নোনা জল মিলিয়ে ২৭২ প্রজাতির মাছের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে রয়েছে ইলিশের কথাও।

    হ্যামিল্টনের ওই কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল এক বাঙালি শিল্পী ‘হালুদার’–এরও। যদিও তাঁর পদবিটুকু ছাড়া আর কোনও তথ্যই আজ আর জানা যায় না। ওই ‘হালুদার’ পদবিটি সম্ভবত ‘হালদার’ ছিল বলে মনে করা হয়। সদ্য ধরা মাছ সামনে রেখে হ্যামিল্টনের তত্ত্বাবধানে হালুদার যে রঙিন ছবি আঁকতেন, সেগুলিই মাছগুলির বৈজ্ঞানিক পরিচয় নথিবদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী মৎস্যবিজ্ঞানীদের উদ্ধৃত ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, সেই সময় গঙ্গার ইলিশ কানপুর ও আগ্রা পর্যন্ত পৌঁছত। একটা সময়ে গঙ্গার দীর্ঘ উজানপথই ছিল তার স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র। ১৮২২-এর সেই নথি তাই শুধু মাছের ইতিহাস নয়, বদলে যাওয়া গঙ্গারও ইতিহাস।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭০-এর দশকে ফরাক্কা ব্যারেজ চালু হওয়ার পর গঙ্গার স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বদলে যায়। ফলে সমুদ্র ও নদীর মধ্যে যাতায়াতকারী ইলিশের প্রজনন-অভিযাত্রাও ধাক্কা খায়। দূষণ, নদীর চরিত্রের পরিবর্তন, বাসস্থান নষ্ট হওয়া এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

    তবে দেরিতে হলেও এর সংশোধনের কাজও শুরু হয়েছে। ফরাক্কার পাশাপাশি গঙ্গায় মাছের যাতায়াতের পথ খুলে দিতে ‘ফিশ ল্যাডার’ তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে। দিল্লির ওয়াজিরাবাদ, হরিয়ানার হাতনিকুণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশের ওখলা ব্যারাজে এমন ব্যবস্থা তৈরির সুপারিশও করেছে আপার যমুনা রিভার বোর্ড। সিফরির প্রয়াগরাজ দপ্তরের অধিকর্তা বি আর চভন এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইলিশ ফেরাতে আমাদের সিফরি এবং জাতীয় স্বচ্ছ গঙ্গা মিশন মাছের ‘র‌্যাঞ্চিং’, ‘ট্যাগিং’ এবং নজরদারির কাজ চালাচ্ছে। ফারাক্কার কাছে যে সব ট্যাগ করা ইলিশকে ছাড়া হয়েছিল, তাদের উত্তরপ্রদেশের কয়েকশো কিলোমিটার দূরত্বর মধ্যে পাওয়াও গিয়েছে।’

    মৎস্যবিজ্ঞানের পরিভাষায় র‌্যাঞ্চিং হলো কোনও নদী, হ্রদ বা জলাশয়ে কৃত্রিম ভাবে উৎপাদিত বা সংগৃহীত মাছ ছেড়ে দেওয়া। যাতে সেগুলি সেখানে বেড়ে ওঠে, প্রজনন করে এবং পরে সেই মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অন্য দিকে ‘ট্যাগিং’ হলো মাছ বা অন্য কোনও প্রাণীর শরীরে একটি বিশেষ চিহ্ন বা ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে তাকে শনাক্তযোগ্য করে ফের স্বাভাবিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া।

    গাজ়িপুরে নমামি গঙ্গে প্রকল্পের আধিকারিকরা জানান, গত সপ্তাহে বিজ্ঞানীরা দু’টি ইলিশ পেয়েছেন। শনিবার স্থানীয় বাসিন্দারাও ইলিশ দেখেছেন বলে খবর। যদিও তাদের বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। সিফরি জানিয়েছে, গাজ়িপুরে পাওয়া মাছ দু’টির মোট ওজন প্রায় ৭৪০ গ্রাম।

    তবে, ওই অঞ্চলে ইলিশ পাওয়ার গুরুত্বকে ‘অন্য রকম’ বলে দাবি করেছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ়ুলজি–র অধ্যাপক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ নীতা সেহগল। তিনি বলেন, সমুদ্রে ও উপকূল অঞ্চলের জলে জীবনচক্রের বেশির ভাগ অংশ কাটিয়ে প্রজননের সময় নদীর মিষ্টি জলে উঠে আসা এই মাছের নদীতে উপস্থিতিকে জলজ পরিবেশের স্বাস্থ্যের অন্যতম সূচক হিসেবে দেখা হয়।’ এই কারণেই উত্তরপ্রদেশে ইলিশের উপস্থিতি গঙ্গায় দূষণ কমারও ইঙ্গিতবাহী।

  • Link to this news (এই সময়)